yllix.com

Monetize your website traffic with yX Media

অশোকের শীলালিপি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয়

 ভূমিকা ঃ মৌর্যবংশীয় শ্রেষ্ট সম্রাট অশোক খৃঃপূর্ব ২৭৩ অব্দে মগধের সিংহাসনে আরোহন করেন। অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর ন্যাগ্রোধা শ্রমণের নিকট অপ্রমত্ত বাণী শ্রবণ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে। তারপর তিনি বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধির জন্য আতœনিয়োগ করেন। তিনি পর্বত গ্রাত্রে, স্তম্ভে, শিলালিপিতে বুদ্ধের বাণী লিপিবদ্ধ করে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার ও প্রসার সাধন করেন। নিম্নে অশোকের শিলালিপি সম্পর্কে আলোচনা করা গেল ঃ

অশোকের শীলালিপি ঃ অশোকের শীলালিপি গুলো পর্বত গ্রাত্রে, স্তম্ভে উপর এবং গুহার অভ্যন্তরে পাওয়া গেছে। তাই এগুলোকে যথাক্রমে শিলালিপি, স্তম্ভলিপি এবং গুহালিপি বলা হয়। শিলালিপি এবং স্তম্ভলিপিকে আবার প্রধান ও অপ্রধান এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। প্রধান লিপি গুলো বিশদ, অপ্রধান লিপি গুলো তুলনায় সংক্ষিপ্ত। সুতরাং সর্ব মোট অশোকের শিলালিপি পাঁচ প্রকার্রে যথা- প্রধান শিলালিপি, অপ্রধান শিলালিপি, প্রধান স্তম্ভলিপি, অপ্রধান স্তম্ভলিপি এবং গুহালিপি। শিরালিপি গুলো সাম্রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে পাওয়া গেছে আর স্তম্ভলিপি গুলো সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে অনেকটা কেন্দ্রস্থলে। ১৮৩৭ সালে কলকাতা ঠাকশালের কর্মচারী এবং এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত জেমস্ প্রিনসেপ সর্বপ্রথম অশোকের শীলালিপির পাঠোদ্বার করেন।
ভারতের ইতিহাসে অশোকই প্রথম সম্রাট যিনি তাঁর আর্দশ এবং কৃতিত্ব এভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। চিন্তায় ও কাজে তদানীন্তন ভারতের নিকট প্রতিবেশী পারস্যে আর্কিমেনীয় বংশের প্রথম সম্রাট দারয়রৌষ অনুরুপ লেখা প্রচার করেছিলেন। দুই জনের লিপিতেই মুখবন্ধ প্রায় একই রকমের। তাছাড়া অশোকের লিপিতে দিপি নিপিষ্ট ইত্যাদি কয়েকটি শব্দ পাওয়া যায় গেছে, যেগুলোর উৎপত্তি পারস্য দেশীয় বলে মনে করা হয়। সুতরাং অনেক অনুমান করেন যে, অশোকের এই কাজের পিছনে পারস্যের প্রেরণা ছিল।
সম্রাট অশোক সাধারনত তাঁর কোন লিপিতে নিজের নাম ব্যবহার করেননি। অনেক লিপিতে মুখবন্ধে তিনি “দেবানাং পিয়ে পিয়দশি এবস আহু ” এই কথা গুলো লিখেছেন। নিজেকে “দেবানাং পিয়” বলে অভিহিত করে তিনি যে, তাঁর শাসন কার্যে স্বর্গীয় অধিকার দাবী করেছেন এমন বলা যায় না। আবার প্রাচীন ভারতে অশোকই একমাত্র ব্যক্তি নন, যিনি নিজেকে “দেবানাং পিয়’’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সুতরাং এই লিপি গুলো প্রকৃত পক্ষে অশোকের কিনা এ বিষয়ে একদা পন্ডিতমহলে সন্দেহ ছিল। কিন্তু মাসকিতে প্রাপ্ত অশোকের প্রথম অপ্রধান শিলালিপি  এ বিষয়ে সন্দেহের নিরসন ঘটিয়েছে। সেখানে  ‘‘দেবানাং পিয়স অশোকস’’ অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয় অশোক এই শব্দ দুটি পাশাপাশি পাওয়া গেছে।
অশোকের প্রধান শিলালিপির সংখ্যা চৌদ্দ। এগুলোর সারিবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং এদের সবগুলো মিলে একটি সম্পূর্ন সংগ্রহ। যে স্থান গুলোতে এই লিপি গুলো পাওয়া গেছে, সে গুলো হল পেশোয়ারের অর্ন্তগত শাহাবাজগাঢ়ি, হাজারা জেলায় অর্ন্তগত মানশেরা দেরাদুনের অন্তর্গত কালসি, কাথিয়াবাড়ের অন্তর্গত গিরনার, মহারাষ্ট্রের অন্তর্গত নানা জেলায় সোপারা গঞ্জাম জেলায় জৌগড় অন্ধ্রেকুরনুল জেলায় ইয়েরাগুড়ি এবং পুরী জেলায় ধৌলি। জৌগড়ে এবং ধৌলিতে একাদশ এবং দ্বাদশ শিলালিপির পরিবর্তে দুটি বিশেষ লেখা পাওয়া যায়। এদের কলিঙ্গ লিপি বলা হয়। অশোকের কলিঙ্গ জয়ের পরে এই লেখা দুটি প্রচারিত হয়। আরমীয় অক্ষরে লেখা অশোকের একটি লিপি তক্ষশিলায় এবং আর একটি পূর্ব আফগানিস্তানে জালালাবাদে পাওয়া গেছে। ত্রয়োদশ শিলালিপিতে অশোকের সাম্রাজ্যের সীমান্তের যে বর্ননা আছে, সেই সীমান্ত অঞ্চলে এই প্রধান শিলালিপি গুলো পাওয়া গেছে।
অশোকের অপ্রধান শিলালিপির মাত্র দুইটি। প্রধান শিলালিপি গুলোর মত এরা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত নয়। বরং বলা যায় এরা পরস্পরের বিচ্ছিন্ন। প্রধান শিলালিপির গুলোর মত এগুলো বিশদ নয় সংক্ষিপ্ত। এদের মধ্যে প্রথমটি পাওয়া গেছে জববলপুর জেলার রুপনাথে এবং দ্বিতীয়টি ছিল জয়পুরের বৈরাটে। প্রথমটির ভাষান্তর শাহাবাদ জেলায় সাসারামে, জয়পুরের বৈরাটে, রায়চুর জেলার মাসাকিতে এবং বদ্ধির্ত আকারে মহীশুরের অর্ন্তগত চিতল দ্রুগ জেলার সিদ্দপুর, জতিঙ্গ রামেশ্বর এবং ্ব্রহ্ম গিরিতে পাওয়া গেছে। এই অপ্রধান শিলালিপির দুইটির ভাষান্তর মাদ্রাজ প্রদেশের অন্তর্গত কুরনুল জেলার ইয়েবা গুড়িতে এবং একদা নিজাম রাজ্য কোপবলে পাওয়া গেছে। এই স্থান গুলো ছিল পাঙ্গুড়ারিয়া মৈধ্য প্রদেশ শিহোর জেলা। নিট্টুর এবয় উড়ে গেলাম কের্ণাটক, বেলারি জেলা। প্রাকৃত ভাষা ছাড়াও গ্রীক এবং আরমীয় ভাষায় লিখিত অশোকের লিপি পাওয়া গেছে। এগুলোকে অপ্রধান লিপি অথবা প্রধান লিপি গুলোর ভাষান্তর বলা যায়। তক্ষশিলা, পল-ই-ডরুন্ত লাঘমন উপত্যকা, কান্দাহার এবং তৎসংলগ্ন সারিকুনা এগুলোর প্রাপ্তি স্থান। মোটামুটি ভাবে থোন কম্বোজ অঞ্চলে গ্রীকরা থাকে প্যারো পানিসদয় এবং গেড্রোসিয়া বলত এ গুলো পাওয়া গেছে।
অশোকের প্রধান স্তম্ভলিপি সাতটি। এই সাতটি লিপিই দিল্লীর একটি স্তম্ভের উপর পাওয়া গেছে। এই স্তম্ভটি সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘল অদুরবর্তী তোপরা গ্রাম থেকে এখানে এনেছিলেন। সাতটি লিপির মধ্যে প্রথম ছয়টি ভাষান্তর দিল্লীর আর একটি স্তম্ভের উপর পাওয়া গেছে। একই সুলতান এই স্তম্ভটি মীরাট থেকে এখানে এনেছিলেন। এলাহাবাদের একটি স্মম্ভের উপর অনুরুপ ভাষান্তর পাওয়া গেছে। সম্ভবত আকবর এই স্মম্ভটি কোশাম্বী থেকে এখানে এনেছিলেন। এছাড়া প্রথম ছয়টি লিপির ভাষান্তর বিহারের চম্পারণ জেলার অর্ন্তগত লৌরিয়া আরারাজ, লৌরিয়া নন্দনগড় এবং রাম পর্বতে পাওয়া গেছে। মগধ থেকে নেপাল যাত্রার পথে এই তিনটি স্থান অবস্থিত। অশোক বুদ্ধের জন্ম স্থান লুম্বিনী গ্রামে যাওয়ার সময় এই পথে গিয়েছিলেন। মনে হয় অশোকের এই যাত্রাকে স্মরনীয় করে রাখার এই স্মম্ভ গুলো নির্মিত।
অশোকের অপ্রধান স্তম্ভলিপি তিনটি। প্রথমটি পাওয়া গেছে বারাণসীর নিকটবর্তী সারানাতে এবং ভূপালে অর্ন্তগত সাচিঁতে দ্বিতীয়টি বুদ্ধে জন্মস্থান লুম্বিনী গ্রামে এবং তৃতীয়টি এরই অদুরে নিগলিভতে। গুহালিপি পাওয়া গেছে গয়া জেলায় বারাবার পাহাড়ে। আজীবকদের জন্য অশোকের দানের উল্লেখ এই লিপিতে পাওয়া যায়।
পরিশেষে বলা যায়, অশোকের বেশির ভাগ অনুশাসন প্রাকৃত ভাষা এবং ব্রাহ্মী লিপিতে রিখিত। প্রাকৃত ভাষায় রচিত লিপি গুলোর মধ্যে শুধু মাত্র শাহবাজগাঢ়ি এবং মানসেরার অনুশাসন মধ্যে স্থানীয় অধীবাসীদের সুবিধার জন্য খরোষ্টি লিপিতে লেখা। কয়েকটি লিপিতে গ্রীক এবং আরমীয় ভাষা এবং লিপি ব্যবহৃত হয়েছিণ।
–    সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু
বি,এ (অনার্স) এম, এ. এম, এড.

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.