yllix.com

Monetize your website traffic with yX Media

পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান ও আত্মত্যাগ

1509749_368128980059545_1360628465828890312_nবিশ্বজুড়ে উন্নত জাতিসত্ত্বাসমূহ বুঝতে পেরেছেন যে, দেশের জনসমষ্টিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উপাদনশীলতায় সর্বাধিক সহায়করূপে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে প্রতিটি মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে তার সুপ্ত সম্ভাবনার পরাকাষ্ঠা ঘটিয়ে এবং তা যথার্থ শিক্ষা প্রদানের ভিতর দিয়ে। একজন শিক্ষা বঞ্চিত ব্যক্তি সমাজের জন্য বোঝা মাত্র। কারণ সমাজ থেকে সে যা নেয় তার চেয়ে অবদান কম রাখতে পারে। কোন সমাজের মানুষ যখন প্রায়শ ঋণাত্নক অবদান রাখতে থাকে, তখন সে সমাজকে সামগ্রিকভাবে নির্ভশীল হয়ে থাকতে হয় অন্য কোন জাতির উপর। কোন সমাজ বা জাতি বিকশিত ও অগ্রসর হতে চাইলে, এমনকি টিকে থাকতে হলে, তাকে শিক্ষিত হতে হবে যথার্থভাবে। একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে ঘিরে অনেক সংখ্যক দক্ষ ও ত্যাগী মানুষ সমবেত হতে পারে, এমন কোন যৌথ কাজের আয়োজনে, যা ঐ শিক্ষিত ব্যক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, তার প্রজ্ঞা ও উদ্ভাবনমূলক পরিকল্পনায়। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যেখানে পরিবর্তনীয় ও গতিশীলতা প্রয়োজন সমগ্র ব্যবস্থাপনায়, সেখানে দায়িত্ববোধ ও বিচারশক্তি অত্যন্ত প্রয়োজন এবং তা একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিই শুধু দিতে পারে। তাই কবি বলেছেন, “শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড”। মেরুদন্ড যেমন মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে, শিক্ষাও তেমনি কোন জাতিকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শক্তি সঞ্চার করে। জাতির উন্নতি ও সফলতা নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। যে জাতি যত বেশী শিক্ষার আলো লাভ করেছে, সে জাতি ততবেশী উন্নতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। জাতির জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা মানুষকে যথার্থ মানুষ করে গড়ে তোলে। সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রেও শিক্ষার গুরুত্ব সবার্ধিক। শিক্ষাবিহীন জাতি কান্ডারিবিহীন তরীর মতো। শিক্ষা ও জ্ঞানের সাধনা ছাড়া কোনো জাতি বড় হতে পারে না। শিক্ষাকে তাই মেরুদন্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মেরুদন্ডহীন মানুষ এ জগতে অপদার্থ, মূল্যহীন। শিক্ষাহীন জাতিও পৃথিবীর অবজ্ঞার পাত্র। তাই যুগে যুগে বিভিন্ন জাতির অগ্রসর মনীষীরা অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন স্বজাতির মাঝে শিক্ষার আলো বিস্তার ঘটাতে। পার্বত্য চটগ্রামেও শিক্ষা বিস্তারের জন্য রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের, উপ-সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের, ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের, ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের, ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের ও ভদন্ত সুমনা মহাথের প্রমূখ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান ও আত্মত্যাগ অতুলনীয়। তাঁরা নিরলস প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোনঘর শিশু সদন, বনফুল চিলড্রেন হোম, শিশু করুণা সংঘ, কাচালং শিশু সদন, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন, গিরিফুল ও বুদ্ধ শিশুঘরসহ অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে এ অনাথ আশ্রমগুলোর মাধ্যমে এযাবত বহু অসহায়, ছিন্নমূল,  অনাথ শিশু আলোকিত জীবন লাভ করেছেন। তারা আজ দেশে বিদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজ তথা জাতির মুখ উজ্জল করেছেন। নি¤েœ পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে আলোচনা করা গেল :
পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচিতি :
আয়তন নিশ্চিতভাবে সম্ভবত কেউ জানেনা, এক মতে, ৫,০৯৩ বর্গমাইল, আরেক মতে, ৫,১৩৮ বর্গমাইল বা ১৩,০০ বর্গ কি:মি:। মোটামুটি বাংলাদেশের দশ ভাগের একভাগ। ১৯৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে ভাগ করা হয় তিনটি জেলায়। যথা- খাগড়াছড়ি জেলা, মাঝখানে রাঙ্গামাটি জেলা এবং দক্ষিণে বান্দরবান জেলা। খাগড়াছড়ি জেলার আয়তন ২,৬৯৯.৫৬ র্বগ কিমি, রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন ৬,১১৬.১৩ বর্গ কিলোমিটার, আয়তন ৪,৪৭৯.০৩বর্গ কিলোমিটার। এই জেলাকে আবার তিনটি সাব ডিভিসনে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (১) সদর সাবডিভিসন- রাঙ্গামাটি (চাক্মা সার্কেল), (২) বান্দবান সাবডিভিসন- বান্দরবান (বোমাং সার্কেল), (৩) রামগড় ডিভিসন- রামগড় (মং সার্কেল)।
ভৌগলিকভাবে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি পাবর্ত্য প্রদেশ ও মায়ানমারের পশ্চিম সীমান্তের সাথে সংযুক্ত। উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য দক্ষিণে মায়ানমারের আরাকান প্রদেশ, উত্তর ও উত্তর পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য এবং পশ্চিমে বাংলাদেশের সমতল উপকুলীয় জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা অবস্থিত।
ক্যাপ্টেন. টি. এইচ লুইন উল্লেখ করেছেন পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণ ও পূর্বে  আরাকান প্রদেশের নীল পর্বতশ্রেণী এবং উত্তরে ফেনী নদী যা অর্ধ ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করে রেখেছে। উত্তর পূর্বাংশের সীমান্ত সঠিকভাবে নির্দিষ্ট নয় তবে ঐদিকে স্বীকৃত বৃটিশ প্রভাবাধীন পার্বত্য উপজাতীয় অঞ্চল পর্যন্ত ধরা যায়। মোটামুটি ভাবে চট্টগ্রাম জেলার সমভূমিতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত ফেণী, কর্ণফুলী, সাংগু, মাতামুহুরী ও তাদের উপনদী সমূহের জলধারা বেষ্টিত ভূ-ভাগ এই জেলা পরিসর ( চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীবৃন্দ, ১৯৯৬ইং, পৃষ্ঠা- ৪)।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রধান নদী সাতটি। যথা- চেংগি, মাইনী, কাচালং, কর্ণফুলী, রাইন খিয়াং, সাংগু, মাতা মহুরি। প্রধান হ্রদ কাপ্তাই, এটি কৃত্রিম হ্রদ যার আয়তন ২৬৫ বর্গ মাইল। জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে এটি সৃষ্টি হয়। এর দৈর্ঘ্য ১,৮০০ ফুট। এ ছাড়া আছে দুটি প্রাকৃতিক হ্রদ। যথা- রাইন খিয়ান কাইন ও বোগা কাইন বা বগা লেক। বগা লেকটি বান্দরবান জেলায় অবস্থিত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম তিনটি জেলায় থানা বা উপজেলা আছে ২৫টি। খাগড়াছড়িতে ৮টি। রাঙ্গামাটিতে ১০টি। বান্দরবানে ৭টি।
১৯৯১ সালে লোকসংখ্যা গণনা অনুযায়ী পাবর্ত্য চট্টগ্রামের মোট লোকসংখ্যা ৯,৭৪,৪৪৫ জন, উপজাতি ৬,৬৩,০৭৭জন আর বাঙ্গালি ৩,১১,৩৬৮জন। চাকমা ৩,০৬,৬১৬জন, মারমা ১,৭৬,২৩০জন, ত্রিপুরা ১,০২,৪৫৫জন, মুরং ৩২,০৯৮জন, তঞ্চগ্যা ২১,১৪০জন, বোম ৫,৫৮৪জন, পাংখু ১,৬৬৮জন, খুমি ১,০৯১জন, উসাই ৯৬৬জন, খিয়াং ১,৩২৯জন, চাক ৭৯৮জন, লুসাই ৬৬৯জন, রিয়াং ২,৪৩৪জন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি আদিবাসী বসবাস করে থাকেন। এগুলো হল ঃ চাকমা, মারামা, ত্রিপুরা, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, বৌম, পাংখু, খুমি, উসাই, খিয়াং, ছাক, লুসাই, রিয়াং (www. rangamati.gov.bd, www. khagrachhari.gov.bdwww. bandarban.gov.bd)|
শিক্ষা কি?
সাধারণভাবে বলা যায় যে, মানুষের আচরণের কাঙ্খিত, বাঞ্চিত এবং ইতিবাচক পরির্বতনই হলো শিক্ষা। যুগে যুগে নানা মনীষী নানাভাবে শিক্ষার সজ্ঞায়িত করেছেন। আবার সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার সংজ্ঞা বা ধারণায় পরির্বতন এসেছে। শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ ঊফঁপধঃরড়হ এসেছে ল্যাটিন শব্দ বফঁপধৎব বা বফঁপধঃঁস থেকে। যার অর্থ ঃড় ষবধফ ড়ঁঃ অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা। সক্রেটিসের ভাষায় ‘শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।’ ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা’- এরিস্টটল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘শিক্ষা হল আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।
শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত শেখে। তাই শিক্ষার লাভের ধরন বিভিন্ন। শিক্ষার ধরন ৩টি, ১. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, ২. অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, ৩. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা।
শিক্ষা গুরুত্ব :
শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করতে পেরে বুদ্ধ বলেছেন,
বাহুসচ্চঞ্চ, সিপ্পঞ্চ, বিনযো চ সুসিক্খিতো,
সুভাসিতা চা যা বাচা, এতং মঙ্গলমুত্তমং।
অর্থাৎ- বহু ধর্মশাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা, বিবিধ শিল্পশাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করা, বিনয়ী ও শিক্ষিত হওয়া এবং মিথ্যা না বলে সুভাসিত বাক্য ভাষণ করা, ইহাই উত্তম মঙ্গল। (মহামঙ্গল সূত্র, ৪র্থ গাথা)
পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করা মাত্রই আমাদের শিক্ষাক্রম শুরু হয়। সেই শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান পরিবার ও সমাজ। পরবর্তী ধাপ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু স্কুল, কলেজে পড়ার সৌভাগ্য সবার হয় না। এক জন ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে অতিসহজেই স্কুল, কলেজে যেতে পারে, কিন্তু একজন দরিদ্র সন্তান তা পারে না। কিন্তু শিক্ষা আসলে জন্ম মাত্র পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা ১৫ ধারায় বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দ্বায়িত্ব হবে (ক) অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, আশ্রয় ও শিক্ষা জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা হবে।” এ থেকে স্পষ্ট হয় যে রাষ্ট্র বা সরকারের সাংবিধানিক দ্বায়িত্ব হচ্ছে সকলের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। শুধু মাত্র একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য শিক্ষা নয়। এদেশের আপামর সকল জনতার শিক্ষার দ্বায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে সমাজের যেই শ্রেনিরই হোক না কেন, শিক্ষা তার অধিকার। যেহেতু শিক্ষা সবার জন্য প্রযোজ্য এবং এর সার্বিক দ্বায়িত্ব রাষ্ট্রের সেহেতু শিক্ষা জনগণের অধিকার। এ কথা মনে রাখা জুরুরী যে শিক্ষা আমাদের জন্য কোনো সুযোগ নয় বরং অধিকার।
শিক্ষা মানুষের অমুল্য সম্পদ। শিক্ষা কেউ কিনে নিতে পারে না এমনকি শিক্ষা কারো কাছ থেকে কেড়েও নেওয়া যায় না। শিক্ষা এমনি একটা জিনিস যা মানুষকে অর্জন করতে হয় নিজের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে। আর তাই বলা হয় শিক্ষা মানুষের অমুল্য সম্পদ। একটি দক্ষ, মর্যাদাবান ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম ও মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের মত শিক্ষা আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করা এবং প্রান্তিক মানুষেরা দারিদ্র্যের রাহুচক্রে আবদ্ধ হওয়ার ফলে শিক্ষার অধিকার লংঘিত হচ্ছে। তাই শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ যথাযথ দায়িত্ব পালন করে দারিদ্রের রাহুচক্র হতে বেরিয়ে আনতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা হার :
১৯৬১ ইংরেজীতে লোক গণনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিল ৪৯,২৮০ জন। তৎমধ্যে ৩৪,৭৩৩ জন পুরুষ এবং ৫,৫৪৭ জন নারী। শতকরা ১২% শিক্ষিত। ১৯৯১ সালে লোক গণনার রির্পোটে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় তখন ৪৫% জন শিক্ষিত সংজ্ঞা লাভের যোগ্য ছিল। বর্তমানে বান্দরবান জেলায় শিক্ষার হার ৩৫.৯%। পুরুষ ৪০.৩%, মহিলা ৩০.৯% (রোয়াংছড়ি ২০%, বান্দরবান সদর ৪৩.২%, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩২.৩%, থানচি ১৪%, লামা ৩০.৪%, আলীকদম ৩৭.১%, থানচি ১৫.১%। খাগড়াছড়ি জেলায় শিক্ষার হার ৪৪.০৭%। পুরুষ ৫৪.১৯%, মহিলা ৩৩.৬২% (খাগড়াছড়ি সদর ৫০.৪০%, মহালছড়ি ৪০%, মানিকছড়ি ৪০.৭০%, লক্ষীছড়ি ৩৫.২০%, দীঘিনালা ৪৬%, মাটিরাঙ্গা ৪৪.২০%, রামগড় ৪৬.৩৯%, পানছড়ি ৩৪.৬%। রাঙ্গামাটি জেলায় শিক্ষার হার ৪৩.৬০%, পুরুষ ৫১.৪৭%, মহিলা ৩৪.২১%, (কাপ্তাই ৭৯%, কাউখালী ২৫%, নানিয়ারচর ৪৮%, রাজস্থলী ২৬.৪০%, বরকল ১৮.৪০%, লংগদু ১৫.১০%, জুরাছড়ি ৩৫.৮৬%, বিলাইছড়ি ১২.৮৩%, বাঘাইছড়ি ৬১% (খাগড়াছড়ি জেলা বাংলাপিডিয়া, রাঙ্গামাটি জেলা বাংলাপিডিয়া, বান্দরবান জেলা বাংলাপিডিয়া)।
শিক্ষা বিস্তারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান ও আত্মত্যাগ:
মহামানব গৌতম বুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত পুত ও পবিত্র ভিক্ষুসংঘের প্রত্যেক সদস্য আত্মহিত এবং পরহিতে সদা সর্বদায় নিবেদিত প্রাণ। তারই আনুপূর্বিক ধারাবাহিকতায় প্রাগুক্ত প্রাতঃস্মরণীয় সংঘ মনীষীরা  অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, শ্রম ও মেধা দিয়ে বহু জনকল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। তাঁদের নিজেদের চাওয়া-পাওয়া বলতে কিছুই নেই। সব কিছু ত্যাগ করে সন্যাস জীবন গ্রহণ করেছেন। এই মহৎজীবন গ্রহন করেছেন বিধায় সমাজ ও জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁরা অন্য পাঁচ, দশজনের মতো যদি গৃহী জীবন গ্রহণ করতেন তাহলে তখন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হতো। তাঁরা সংসারের ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বাসনা ত্যাগ করে সর্দ্ধম ও শিক্ষা বিস্তারে ব্রতী হয়ে অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
অতীতে যে সমস্ত বৌদ্ধ বিহার তথা আশ্রম শিক্ষা বিস্তার ও সদ্ধর্ম উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল তার মধ্যে নালান্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরি, ময়নামতির শালবন বিহার, চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার ইত্যাদি বিহারসমূহ উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন সময়ে এই বৌদ্ধ বিহারগুলো ছিল ভারতবর্ষে এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিদ্যাপীঠ সমূহে আশ্রয় নিয়ে শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু, শ্রমণ ও সাধারণ জনগণ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে জগতে খ্যাতি অর্জন করেছেন। চীন, জাপান, তিব্বত, তুর্কিস্থান, গান্ধার ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষার জন্য এখানে আসতেন। বিদ্যাশিক্ষা ছাড়াও এখানকার ছাত্র, শিক্ষক সব সময় দেশে বিদেশে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের মুলতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষকে বজ্রচার্য বলা হতো। বিশেষ করে খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতক থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান গুলোর সাড়ম্বর অগ্রগতি ছিল। পালবংশের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এর শ্রীবৃদ্ধি উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল।
পার্বত্য চটগ্রামেও শিক্ষা বিস্তার জন্য রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের, উপ-সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের, ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের, ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের, ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের ও ভদন্ত সুমনা মহাথের প্রমূখ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান ও আত্মত্যাগ অতুলনীয়। তাঁরা নিরলস প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোনঘর শিশু সদন, বনফুল চিলড্রেন হোম, শিশু করুণা সংঘ, কাচালং শিশু সদন, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন, গিরিফুল ও বুদ্ধ শিশুঘরসহ অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের শিক্ষা বিস্তারের অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি শৈশবকাল থেকে যেমন প্রবল শিক্ষানুরাগী ছিলেন তেমনিভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় উপযুক্ত শিষ্য ও আলোকিত সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের মহাস্বপ্ন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে গবীর নিরীহ অসংখ্য ছেলে-মেয়েকে তাঁর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে লেখাপড়া করতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে চাকমা রাজ বিহারে পালিটোল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংগঠন “পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ-বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া তিনি “বোধিচরিয়া শিশু করুণা সংঘ” অনাথ আশ্রমে সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রাখেন। তিনি ১৯১৩ সালে ২৩ নভেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় কুতুবদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর গৃহী নাম ছিল ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা, পিতার নাম রুদ্রশিং তঞ্চঙ্গ্যা, মাতার নাম ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যা। ১৯৩৫ সালে শ্রীমৎ উ. তিস্স মহাথেরোর নিকট প্রব্রজ্যা এবং ১৯৩৯ সালে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে বার্মা গমন করে লেপেডং ও কামায়ুড বিশ্ববিদ্যালয় হতে পালি সাহিত্যে এম, এ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি স্বজাতির রক্ষার্থে সোচ্চায় হয়ে আন্তজার্তিক ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বৌদ্ধদের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের কথা তুলে ধরেন। ফলে সরকারের রোষানলে পড়ে ভারতে পালিতে যেতে বাধ্য হন। ২০০১ সালে ১৭ জানুয়ারী সুদীর্ঘ ২৪ বছর ভারতে অবস্থান করারপর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। অবশেষে ২০০৮ সালে ৫ জানুয়ারী ৯৫ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন (রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির জীবন ও কর্ম, ড. জিনধোধি ভিক্ষু, ২০০৮ইং, পৃষ্ঠা-০৭, ৩৫)।
পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম :
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরম শ্রদ্ধেয় ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের আগমনের ফলে পাহাড়ি বৌদ্ধদের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে এক নব দিগন্তের সুচনা হয়। কারণ তিনিই প্রথম বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গরীব, অনাথ ও অসহায় শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা সুচনা করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে রাউজান বিমলানন্দ বিহার ত্যাগ করে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থানাধীন মুবাছড়ি গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ কর্মী বিন্দু কুমার খীসা কর্তৃক নির্মিত বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেন। তিনি অনুভব করলেন এখানে অত্যন্ত সহজ, সরল মনের অধিকারী অগণিত পাহাড়ি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি বসবাস। তারা সত্যিকারের বৌদ্ধিক ধর্মীয় অনুশাসন ও সাধারণ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। ধর্মপ্রচার বা ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে আর্দশ বৌদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে হলে সাধারণ শিক্ষার কার্যক্রমকে জোরদার করা অপরিহার্য। তাই তিনি অজ্ঞানতা অন্ধকারকে দুরীভূত করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাময় শিক্ষার উন্মেষ ঘটাতে “জ্ঞানোদয় পালি টোল” প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁেধর ফলে এলাকা জলমগ্ন হওয়ায় মুবাছড়ি ত্যাগ করে দীঘিনালা মায়ানী অঞ্চলের বোয়ালখালী দশবল বৌদ্ধ রাজ বিহারে অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে খাগড়াছড়ি দীঘিনালা দশবল রাজ বিহারকে কেন্দ্র করে উপ-সংঘরাজ ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন ত্যাগ, তিতিক্ষার মাধ্যমে সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন “পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম”। প্রতিষ্ঠার পর আশ্রমে আশ্রিত হলো অনাথ, অসহায়, ছিন্নমূল, হতদরিদ্র পাহাড়ি বৌদ্ধ শিশুরা। আশ্রমের শিশুদের ভরণ পোষণের জন্য জনসাধারণের দেওয়া মুষ্ঠি ভিক্ষার উপর তাঁকে নির্ভর করতে হতো। যে দিন শিশুদের অন্ন সংস্থান করতে পারেননি, সেদিন বনের আলু, যাগুভাত, ওল কচু, কাঠাঁল বীচি, কাঠাঁল, কাঁচা কলা রান্না করে খাওয়াতেন পরম মমতায়। এভাবে তিনি নিরন্তর মানবতার সেবায় কাজ করে গেছেন ও যাচ্ছেন। তাঁর পবিত্র সংস্পর্শে এসে অনেক পাহাড়ি বৌদ্ধ শিশু-সন্তান অন্ধকার জীবন হতে আলোকিত জীবন লাভ করেছে। যাঁর ফলশ্রুতিতে আজ আমরা পেয়েছি পরম শ্রদ্ধেয় বিমলবংশ মহাথের, প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, শ্রদ্ধালংকার মহাথেরোর মতো প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত, আলোকিত বৌদ্ধ ভিক্ষু।
১৯৬৮ সালে “পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম”টি সরকারীভাবে রেজিষ্টেশন লাভ করে অনুদান প্রাপ্ত হয়। অতঃপর ভদন্ত ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের এক টানা ১৪ বছর মনপ্রাণ উজার করে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে গড়া প্রতিষ্ঠান ফেলে রেখে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে দশবল বৌদ্ধ রাজ বিহার ত্যাগ করে পুনরায় সমতল অঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি সেখান থেকে চলে আসার সময় তথাকার একজন দায়ক বাবু শরৎ কুমার খীসাকে সভাপতি ও ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের’ সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব প্রদান করে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের এ দায়িত্ব গ্রহণ করে যে প্রতিবন্ধকতার সম্মূখীন হয়েছিলেন তা আলোচ্য প্রবন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের প্রতিবন্ধকতা অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য মহাথের, প্রজ্ঞানন্দ মহাথের ও শ্রদ্ধালংকার মহাথের  ভদন্ত প্রিয়তিষ্য ভিক্ষু, ভদন্ত জিনপাল ভিক্ষুসহ বারো জন ভিক্ষুসহ আত্মনিবেদিত প্রচেষ্ঠায় পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম একটি সার্বঙ্গ সুন্দর অনাথ আশ্রমরুপে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা উপলদ্ধি করতে পারলেন, পাহাড়ি বৌদ্ধরা অধিকাংশই হত দরিদ্র দিনে এনে দিনে খায়। তদুপরি রাজনৈতিকভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। রাজনৈতিকভাবে নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। তাঁরা কি পেটের অন্ন জোগার করবে, না কি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগাবে ? এ রকম কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পাহাড়ি বৌদ্ধ ছেলে-মেয়েদের কিভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় সমুন্নত করা যায় ? বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর পক্ষে এটা করা কি করে সম্ভব ? তারা নিজেরাও পরের উপর নির্ভরশীল। দায়ক-দায়িকারা খাবার দিলেই তাঁরা খেতে পায়। তা সত্ত্বেও তাঁরা উপলদ্ধি করেন যে, শিক্ষা-দীক্ষায় ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ পাহাড়ি বৌদ্ধদের টেনে আনতে হলে গুরুদেবের রেখে যাওয়া পাবর্ত্য চট্টল বৌদ্ধ আশ্রমটিই যথেষ্ঠ। তাই তাঁরা আশ্রমটিকে পুত্রসম মনে করে এর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির জন্য জোরে সোরে কাজ করার মনোনিবেশ করেন। ক্রমান্বয়ে আশ্রমের দখলে থাকা ৩০০(তিনশত) একর জায়গার উপর বনায়ন গড়ে তোলেন। আশ্রমের নামে ২৫.৬০ একর ধান্য জমি ভূ-সম্পত্তিতে উন্নীত করেন। তিনি অসীম দক্ষতার সাথে ধীরে ধীরে ১. আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় ২. কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৩. প্রাইমারী স্কুল ৪. ছেলে ও মেয়েদের আবাসিক হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮৬ সালে ১৪ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমটি সেনাবহিনীর সহায়তায় সেটলার বাঙ্গালিরা আগুনে পুড়ে ধবংস করে দেওয়া হয় এবং জায়গা জমিগুলো জবর দখল করে নেওয়া হয়। এ সেই সময় ৭০ হাজার পাহাড়ী বৌদ্ধ শরনার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেয়। অনাথ আশ্রমের ৩০০জন এতিম শিশুর মধ্যে ৫০জন মোনঘরে আশ্রয় নেয়  এবং ২৫০জন শিশু ১২জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। অনাথ আশ্রমটি সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেও তাঁরা বিন্দুমাত্রও পিছপা হননি। আশ্রমটি এখনও টিকে রয়েছে। বর্তমানে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের সভাপতি ও ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
মোনঘর অনাথ আশ্রম :
১৯৭৪ সালে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে সমতলে যাওয়ার সময় “পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমের” শাখা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি সদরে জায়গা ক্রয় করার জন্য তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরকে তৎকালিন সময়ে নগদ ১০,০০০ (দশহাজার) টাকা প্রদান করেন। কারণ রাঙ্গামাটি শহর হতে “পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম”টির দুরত্ব প্রায় ১২৫ কিলোমিটার। এই দুরত্ব হেতু সরকারী অনুদান লাভের জন্য কোন সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সেখানে পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার ছিল। তদুপরি তখনকার সময়ে রাঙ্গামাটি শহরের সাথে দীঘিনালার যোগযোগ ব্যবস্থা খুবই অনুন্নত ছিল। সে জন্যে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের রাঙ্গামাটি শহরের অনতি দূরে “পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমের” শাখা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি গুরুদেবের দেওয়া দশ হাজার টাকা দিয়ে চার একর পাহাড়ি জমি ক্রয় করেন। ক্রয়কৃত জায়গায় “পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমের” শাখা হিসেবে মোনঘর অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রদ্ধেয় ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির মহোদয় ‘মোনঘর’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন যে, মোনঘর মানে ইংরেজী আক্ষরিক অর্থ করলে হয় Hill Home’ ‘মোন মানে Hill ‘ ঘর মানে Home এ মোনঘর নামকরণের পেছনে Jhoom Cultivation Shifting Cultivation এর বহু ঐতিহাসিক ও বহু নানন্দিক পিছু টানের প্রতি দৃষ্টি রেখে তথা Nostalgic বা অতীত স্মৃতি বিধুর আনন্দ বেদনার প্রতীকিরুপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
১৯৮০ সালে মোনঘর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনীকরণ লাভ করে। এই নিবন্ধন লাভ করার ফলে মোনঘর শিশু সদন প্রথম অবস্থায় ১০ জন অনাথ শিশুকে প্রতিপালনের জন্য সরকারী অনুদান লাভ করতে সক্ষম হয়। সরকারী নিবন্ধন লাভ করার ক্ষেত্রে রাজমাতা মিস আরতি চাকমার অবদান কোন অংশে কমছিল না।
বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশিষ্টি সমাজ সেবক বাবু সুরত চন্দ্র চাকমা ও বাবু খচ্চুয়া চাকমা ৫ (পাচঁ) শতাংশ করে মোট ১০ (দশ) শতাংশ জায়গা বিনা শর্তে দান করেন। এই জায়গার উপর ১৯৭৬ সালে  রাঙ্গাপানি “মিলন বৌদ্ধ বিহার” প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বিহারকে ভিত্তি করেই অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম গড়ে তোলা হয় (মোনঘর অভিভাবক মহাসম্মেলন-২০০৩, স্মরণিকা, রাঙ্গামাটি, ২০০৩ইং)।
ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের আনন্দ বিহারে অবস্থান করে মোনঘরের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাঁর বলিষ্ঠ পরিচালনায় মোনঘর প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৮০ হতে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মোনঘরের স্বর্ণযুগ ছিল। যা পার্বত্য চট্টগ্রামে “বাতিঘর” নামে আখ্যায়িত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অগণিত পাহাড়ি বৌদ্ধ ছেলেমেয়ে মোনঘর আলোয় আলোকিত হয়েছে। রাঙ্গাপানি মিলন বিহারকে ক্ষেন্দ্র করে যে প্রতিষ্ঠান গুলো গড়ে তোলা হয়, তা হল- মোনঘর শিশু সদন (১৯৭৪), মোনঘর এনজিও, মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয় (১৯৮০), মোনঘর পালি কলেজ (১৯৮১),  মোনঘর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (১৯৮৩), মোনঘর সংগীত বিদ্যালয় (১৯৮৩), মোনঘর ফাইন আর্ট স্কুল (১৯৮৩), মোনঘর মিনি হসপিটাল (১৯৮৪), মোনঘর প্রি-ক্যাডেট স্কুল (১৯৯২)।
২০০৮ সালে ২৩ মার্চ মোনঘর শিশু সদনের আশ্রয়ে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে সুবিধা ভোগী কিছু ব্যক্তির চক্রান্তে সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করে ঢাকায় “বনফুল চিলড্রেন হোম” গতিশীল করার কাজে মনোনিবেশ করেন। বর্তমানে শ্রীমৎ শ্রদ্ধালংকার মহাথের তত্ত্বাবধায়ক এবং শ্রীমৎ বুদ্ধদত্ত মহাথের পরিচালক হিসেবে মোনঘরের দায়িত্ব পালন করছেন।
বনফুল চিলড্রেন হোম :
পরম শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য মহাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়াশুনা করতেন তখন তিনি কমলাপুর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করতেন। এ বিহারে অবস্থান করার সময় ঢাকার রাজধানীর বুকে পাহাড়ি বৌদ্ধদের একটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে স্বপ্ন বাস্তবে রুপদান করতে তিনি ১৯৭৬ সালে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তৎকালিন সরকারের কাছে খাস জায়গা বন্দোবস্তির জন্য আবেদন করেন। সে জায়গার উপর ১৯৮৪ খ্রিঃ ঢাকাস্থ মীরপুরে শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে ভারতে আশ্রিত ২৫০ জন এতিম শিশুর অবিভাবকের দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য ভারতে গমন করেন। তিনি ভারতে চলে গেলে “পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ ও মিরপুর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার” এদুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো কাঁধে এস পড়ে। এ বিহারকে কেন্দ্র করে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের  ১. বনফুল চিলড্রেন হোম (১৯৯১), ২. বনফুল প্রাইমারী স্কুল (১৯৯২), ৩. বনফুল আর্ট স্কুল, ৪. বনফুল আদিবাসী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট (২০০৪), ৫. বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ (২০০৪) প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা অনেক ছিন্নমূল, অনাথ, অসহায় শিশু শিক্ষা-দীক্ষায় সমুন্নত হয়েছে।
১৯৯৯ সালে ভূটানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত বাবু শরদেন্দু শেখর চাকমা বিদেশী দাতা সংস্থার নিকট একটি আত্মঘাটি চিঠি প্রেরণ করে সমস্ত সাহায্য বন্ধ করে দেয়। ফলে আশ্রমটি বন্ধ হয়ে গেলে অনাথ শিশুরা মোনঘর আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাদ্য হয়। বেশ কয়েক বছর আশ্রম ভবনটি খালি পড়ে থাকে। পরবর্তীতে অনেক প্রচেষ্ঠার ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোর পর বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজটি প্রতিষ্ঠিা করতে সক্ষম হন। বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজটি তথ্য প্রযুক্তির উপর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান। এখানে বাংলা ও ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে পাঠদান করা হয়। এই কলেজে বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষিকা সংখ্যা রয়েছে ১১৪ জন, ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২২০০ জন, পাহাড়ি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১২০জন ধারণ ক্ষমতা একটি হোস্টেলও রয়েছে। বর্তমানে এই কলেজের সভাপতি ও পরিচালকের দায়িত্বে আছেন ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের (স্পনন্দন, সম্পাদক, ড. অমরকান্তি চাকমা, প্রতিষ্ঠান পরিচিতি, ২০১৪ইং)।
ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের ১লা ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সালে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানাধীন বাবুছড়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম বলেন্দ্র দেব চাকমা। পিতার নাম নরেন্দ্র লাল চাকমা এবং মাতার নাম ইন্দ্রপতি চাকমা। জন্মের ঠিক বছর দেড়েকের মধ্যেই তাঁর পিতা পরলোক গমন করেন এবং তিনি হয়ে পড়েন এতিম। ১৯৬৫ সালে ১৭ বছর বয়সে তিনি ভদন্ত উপ-সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয়ের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান দীঘিনালার বোয়াখালীতে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে এস,এস,সি পাশ করেন। এস,এস,সি পাশের পরপরই তিনি ১৯৬৮ সালে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি চট্টগ্রামের মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে গমন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি নাজিহাট ডিগ্রী কলেজ ও হাটহাজারী কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং তথা থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি ১৯৭০ সালের শেষভাগে হাটহাজারী জোবরা বড়–য়া পাড়ায় জোবরা সুগত বিহারে অধ্যক্ষ পদে অবস্থান করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে বি,এ (অনার্স) ও ১৯৭৮ সালে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর ১৯৮০ সালে পালি সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম, এ ডিগ্রী অর্জন করেন।
বোধিচারিয়া শিশু করুণা সংঘ :
ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের ১৯৮৬ সালে ভারতে আশ্রিত ২৫০ জন এতিম শিশুর অবিভাবকের দায়িত্ব প্রতিপালনের জন্য “পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ ও মিরপুর শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার” ফেলে রেখে ভারতে গমন করেন। ১৯৮৬ সালে ৩০ অক্টোবর কর্মবীর বিমলতিষ্য মহাথের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতাস্থ উত্তর চব্বিশ পরগণা চকপাচুরিয়ায় রাজার হাট নামক স্থানে এক বিশাল জায়গায় বোধিচারিয়া বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিহারকে কেন্দ্র করে  “শিশু করুণা সংঘ” নামে একটি অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে অন্যন্য ভূমিকা রাখেন। সে সময় রাজগুরু অগ্রবংশ অবস্থান করতেন কলিকাত শহরে বৌ বাজারে ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারে। ভদন্ত বিমল তিষ্য মহাথের সেখান থেকে রাজগুরু ভন্তেকে নিয়ে নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত করে তিনি নিজেই সম্পাদক ও পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল- জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের শিশু ও যুব  সম্প্রদায়ের শিক্ষা-দীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করা। বিশেষতঃ পার্বত্য এলাকার অনগ্রসর শিশুদের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রদান করা। এর উন্নয়নে ফ্রান্স সরকার ও সে দেশের দানবীর ব্যক্তিদের সহায়তা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে একটি স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভে করেছে। প্রায় ৫০০/৬০০ ছাত্র-ছাত্রী ইংরেজী শিক্ষায় লেখাপড়া করছে। প্রায়ই ছাত্র-ছাত্রীরা আবাসিক হিসেবে অবস্থান করে থাকে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১৬ শষ্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে প্রতিষ্ঠান সমূহ হল- ১. বোধিচরিয়া ইংরেজী স্কুল, ২. বোধিচরিয়া ছাত্রাবাস, ৩. বোধিচরিয়া স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ৪. বোধিচরিয়া কারিগরি বিদ্যালয়, ৫. বোধিচরিয়া অতিথি নিবাস, 6. Centre for the study and developmen of Traditional Craftd and Arts, 7. Centre for Buddhist Studist and Perservation of Tribal Cultural Heritage, ৮. শিশু করুণা সংঘ অনাথ আশ্রম। এখানে আরো বোধিচরিয়া নামে একটি ত্রৈমাসিক আন্তজার্তিক মান সম্পন্ন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা, ইংরেজী ও চাকমা ভাষায় প্রকাশ করা হয়।
তিনি ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নারডিনো’তে “শাক্য মৈত্রী বৌদ্ধ বিহার এবং ২০০১ সালে ভারতে ঐতিহাসিক তীর্র্থস্থান সারানাথে বোধি ধর্মচক্র বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিহার গুলো প্রতিষ্ঠা করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বৌদ্ধদের আর্ন্তজাতিক ভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।
ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের ১৯৬৩ সালে ১৮ বৎসর বয়সে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলাধীন বোয়ালখালী দশবল বৌদ্ধ বিহারে শ্রীমৎ সুমঙ্গল স্থবিরের নিকট প্রবজ্যা গ্রহন করেন। ভদন্ত সুমঙ্গল স্থবির ছিলেন তাঁর জ্ঞাতী সম্পর্কীয় ভাই। তিনি ১৯৬৬ সালে ১৬মে চট্টগ্রামে জোবরা সুগত বিহারে সংঘরাজ ভদন্ত শীলালংকার মহাথের উপাধ্যায়ত্বে শুভ উপসম্পদা লাভ করেন। কিন্তু গুরু ভন্তে হলেন উপ-সংঘরাজ ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের। ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথেরোর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর নিজ গ্রামের অবস্থিত উদোল বাগান সরকারী প্রাথিক বিদ্যালয়ে। এরপর স্থানীয়  দীঘিনালা জুনিয়র হাই স্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রামের বিনাজুরী নবীর উচ্চ বিদ্যালয় হতে এস, এস, সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭২ সালে হাটহাজারী ডিগ্রী কলেজ হতে এইচ,এস,সি পাশ করেন। তিনি ১৯৭৬সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে বি, এ (অনার্স) এবং ১৯৭৭ সালে এম, এ (দর্শন) পাশ করেন। ১৯৭৮ সালে “পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ” নামে এক ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে পাহাড়ি বৌদ্ধদের মাঝে ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তিনি একাধারে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোনঘর শিশু সদন ও পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ এ তিনটি সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বলিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করেন (শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য মহাথেরোর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য, শিক্ষা, মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির জন্য নিবেদিত প্রাণ এক বৌদ্ধ সন্যাসী, মূল- প্রফেসর পিজে চাকমা, অনুবাদ স্বাগতম চাকমা, পৃঃ- ৭৮-১০৩)।
কাচালং শিশুসদন :
পাহাড়ি বৌদ্ধদের নিকট শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রাখেন আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র উপ-সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের। ১৯৮২ সালে উপ-সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের মগবান শাক্যমনি বৌদ্ধ বিহারকে ভিত্তি করে “কাচালং শিশু সদন” প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষা বিস্তারে সুচনা করেন। তাঁর অগনিত ভক্তবৃন্দের ঐকান্তিক শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিনম্র চিত্তে দান করা টাকা জমা করে রাখেন তীর্থ ভ্রমণ করার জন্য। টাকা জমা করতে করতে আনুমানিক ২০.০০০ (বিশ হাজার) টাকা জমা হয়। তিনি ভাবলেন এই টাকা দিয়ে যদি তীর্থ ভ্রমনে যাই তাহলে একবার মাত্র তীর্থ ভ্রমন করা যাবে। আর যদি অনাথ, অসহায় শিশুদের আশ্রয়দানের জন্য অনাথালয় প্রতিষ্ঠা করি তাহলে বহু অনাথ শিশু আলোকিত জীবন লাভ করবে। এই মানসিকতা থেকে প্রথমে কয়েকজন অনাথশিশুকে নিয়ে “কাচালং শিশু সদন”  অনাথ আশ্রমের সুচনা করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে গরীব, অনাথ ও অসহায় শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করার মানসে বৌদ্ধ বিহারের দেশনালয়ে গ্রামের কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশপাশি সাধারণ শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। দিন দিন শিশু সদনে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ইতিমধ্যে জমাকৃত টাকা শেষ হয়ে গেলে শিশু সদন পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় স্থানী গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় গ্রামে মুষ্ঠি ভিক্ষা প্রচলনের মাধ্যমে অনাথ শিশুদের ভরণপোষণ করেন। গ্রামে সর্বস্তরের জনসাধারণের সহযোগিতার ফলে শিশু সদনে পরিচালনায় গতি ফিরে আসে। এভাবে দীর্ঘ ৭/৮ বছর চলতে থাকে। শিশু সদনের নামে জায়গা না থাকায় সরকারী ভাবে অনুদান পাওয়ারও সম্ভব হচ্ছে না। অতপরঃ বিশিষ্ট সমাজ সেবক বাবু শরৎ কুমার চাকমা (কার্ব্বারী) ৮০ (আশি) শতক জমি দান করে। এর পর ১৯৯১ সালের ২৫ জুলাই সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় অধীনে সরকারী নিবন্ধন লাভ করে পুরোদমে শিশু সদনের কাজ চলতে থাকে। এ শিশু সদনকে ভিত্তি করে মগবান সদ্ধর্ম্মোদয় পালি টোল, বালুখালী নন্দসার পালি টোল, জীবঙ্গাছড়া পালি টোল, কাচালং শিশু সদন মিনি হাসপাতাল, কাচালং সার্বজনীন বির্দশন ভাবনা কেন্দ্র, লাল বিহারী স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজের বিত্তবান, জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ঠ সমাজ সেবকের সাহায্য-সহযোগিতায় উচ্চ শিক্ষা প্রকল্প প্রচলন করে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।
শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাথেরো ১৯৩৭ সালের ২৮ আগস্ট শনিবার রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অন্তগর্ত বরকল উপজেলাধীন শুভলং উইনিয়নের বেতছড়ি গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাথেরো জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাল্য নাম লক্ষী মোহন চাকমা, পিতার নাম কৃষ্ণ মুনি চাকমা, মাতার নাম শিঙা পুদি চাকমা। ১৯৫৬ সালে ১৯ বছর বয়সে শুভলং উন্দ্রমা ছড়া বৌদ্ধ বিহারের সুযোগ্য অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রজ্ঞাসার স্থবিরের নিকট প্রবজ্যা গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে ২২ বছর বয়সে শুভ উপসম্পদা লাভ করেন। তাঁর উপাধ্যায় গুরু ছিলেন শ্রীমৎ আচরান্দ মহাথেরো। অল্প বয়সে মা-বাবা হারানোতে তিনি সাধারণ শিক্ষা তেমন করতে পারেননি। তিনি মাত্র সপ্তম শ্রেনীতে অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। প্রবজ্যা গ্রহন করার পর মহাসংঘনায়ক রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, বৌদ্ধ মনীষা, সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার দশম সংঘরাজ, পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথেরোর তত্ত্বাবধানে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা-র অধীনে সুত্ত উপাধি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৩ সালে মগবান শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ হিসেবে আগমন করেন। এর পূর্বে তিনি কমলছড়ি অ¤্রকানন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করেন। ২০০৭ সালে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক সাদামনের মানুষ নির্বাচিত হয়ে স্বর্ণপদক পুরস্কার প্রাপ্ত হন। ২০১১ সালে সংঘরাজ সুগতপ্রিয় মহাস্থবিরের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপ-সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন(জ্ঞান তাপস উ. পা-িতা স্মারক, সম্পাদক, ভদন্ত বিমলজ্যোতি মহাথের, ১৪মার্চ, ২০১৩ইং পৃষ্ঠা-৩৮)।
পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন :
১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি সদর কমলছড়িস্থ ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের “পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন বৌদ্ধ বিহার” কেন্দ্র করে “পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন” অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু, যুব ও মহিলাদের আত্ম কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দুরীকরণে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া, পশ্চাৎপদ পাহাড়ি বৌদ্ধদের আত্মসামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতৃ-পিতৃহীন অনাথ ষোলজন শিশু সংগ্রহ করে অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর এ প্রতিষ্ঠানটিও সাফল্যে উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় কিছু লোভী, ভোগী, কুচক্রী, বিভেদপন্থী লোকের কারণে আজ এ প্রতিষ্ঠান নিভূ নিভূ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। এটি ১৯৮৫ সালে ৯ সেপ্টেম্বর সরকারী নিবন্ধন লাভ করে। প্রায় চার একর জায়গায় এটি প্রতিষ্ঠিত। তিনি নিজস্ব মেধায় ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন ১. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন পালি কলেজ, ২. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন অনাথালয় (১৯৮৩), ৩. ভোকেশন্যাল ট্রেনিং ইনিষ্ঠিটিউট, ৪. পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৫)। এই স্কুলে বর্তমানে মোট ৯জন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছে ও ৩৫০জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন মেডিকেল ট্রেনিং ইনিষ্ঠিটিউট (ম্যাটস) প্রতিষ্ঠা করেন।
ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা রাঙ্গামাটি কাচালং অববাহিকা লংগদু থানার তিনটিলা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর গৃহী নাম অসীম কুমার তালুকদার, পিতার নাম ধীরেন্দ্র লাল তালুকদার, মাতার নাম শশী প্রভা দেওয়ান। তাঁর পিতা প্রথম স্ত্রী মৃত্যু হলে দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে বাধ্য হন। প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল প্রীতিলতা তালুকদার। ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের রাউজান কলেজ থেকে আই,এ পাশ করেন। ১৯৭৩ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষে সাত দিনের জন্য তিনটিলা লংগুদু বন বিহারে সাধক পুরুষ বনভান্তের কাছে প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হন। নাম হল শ্রীমান সত্যলংকার শ্রামণ। উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের অভিপ্রায় গুরুদেব বনভান্তেকে অবগত করালে প্রাথমিকভাবে বার্মায় যাওয়ার অনুমতি প্রদান করলেও সেবক গঙ্গাধন ওরফে বুড়ো চখির বাপের এক কথায় গুরুদেব মত পাল্টিয়ে বার্মা যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রধান করাতে প্রব্রজ্যা ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পার্শ¦বর্তী রাজ বিহারের অধ্যক্ষ রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের নিকট ১৯৭৫ সালে প্রবজ্যা ও উপসম্পদা গ্রহণ করেন। এরপর একই সালে গুরুদেবের অনুমতিক্রমে বৌদ্ধ প্রধান দেশ বার্মায় গমন করেন। বৌদ্ধ ধর্ম ও বিনয় শিক্ষা শেষ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন পূর্বক ১৯৮০ সালে পানছড়ি “লোগাং সমবায় মৈত্রী বিহারে”র অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহন করেন। তিন বর্ষা যাপন করার পর ১৯৮৩  সালে খাগড়াছড়িস্থ কমলছড়িতে ‘পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করার জন্য কৃতসংকল্প গ্রহণ করেন (নন্দসার স্মারক, সম্পাদক, শ্রীমৎ সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, ২৯ নভেম্বর ২০১৩ইং)।
এছাড়াও পেরাছড়াস্থ ১৯৯১ সালে ভদন্ত জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির ও শাসনপ্রিয় মহাস্থবির গিরিফুল শিশু সদন নামে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ভদন্ত মুক্তিপদ স্থবির আশ্রম পরিচালনা করছে। বৌদ্ধ শিশুঘর (ভদন্ত সুমনা মহাথের), পুরনজয় শিশুসদন, প্রনয় শিশু সদন, বোধিগিরি শিশুসদন (ভদন্ত নন্দপ্রিয় স্থবির ও চন্দ্রমনি ভিক্ষু),  বান্দরবান সাতকমল পাড়া পঞ্চবুদ্ধ অনাথালয়, রোয়াংছড়ি অগ্রবংশ শিশুসদন, নাক্ষ্যং ছড়ি চেতনা শিশু সদন, গাগড়া চন্দ্রবংশ শিশু সদন (সম্বোধি মহাথের), ফারুয়া বৌদ্ধ শিশুসদন, বিলাইছড়ি রাজগুরু অগ্রবংশ শিশুসদন, বাঙ্গালহালিয়া শিশু সদন ( ভদন্ত ক্ষেমাচাড়া মহাথের), শিজক অভয়তিষ্য শিশুসদন (ভদন্ত শীলভদ্র ভিক্ষু) ও লক্ষ্মীছড়ি পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন। এভাবে আরো নাম না জানা অনেক অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শিক্ষা বিস্তারে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন।
পাহাড়ি বৌদ্ধদের নিকট শিক্ষা বিস্তারে সমতল ভিক্ষুদের অবদান :
পাহাড়ি বৌদ্ধদের নিকট ধর্ম ও শিক্ষা বিস্তারে সমতল ভিক্ষুদের অবদান কোন অংশে কম নয়। তাঁরা পাহাড়ি বৌদ্ধ সন্তানদের বিভিন্ন আশ্রমে ও বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে পাহাড়ি বৌদ্ধদের নিকট শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ অবদান রেখেই চলেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকার কমলাপুরে মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর “ধর্মরাজিক বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম”, “হোয়ারা পাড়া অনাথ আশ্রম” (রাউজান), উপ-সংঘরাজ শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথের প্রতিষ্ঠিত “বিনাজুরি শশ্মান বিহার অনাথ আশ্রম” (ইতিমধ্যে আলোচ্য প্রবন্ধে তাঁর শিক্ষা বিস্তারের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে) রাউজান, শ্রীমৎ শীলরক্ষিত মহাথেরোর প্রতিষ্ঠিত “জোবরা অনাথ আশ্রম” (হাটহাজারী), ভদন্ত সংঘপ্রিয় “চন্দ্রঘোনা কেপিএম অনাথ আশ্রম” (চন্দ্রঘোনা), ভদন্ত জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরোর “হিঙ্গলা অনাথ আশ্রম” (রাউজান), “রামকোট অনাথ আশ্রম” (রামু), আব্দুল্লাপুর শাক্য মনি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি মহাথের, শ্রীমৎ শীলভদ্র মহাথের প্রমূখ ভিক্ষুসংঘ। এ সমস্ত অনাথ আশ্রম গুলোর মাধ্যমে পাহাড়ি বৌদ্ধদের শিক্ষা-দীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। এসব অনাথ আশ্রম গুলোতে শত শত পাহাড়ি বৌদ্ধ সন্তানেরা আশ্রয় গ্রহন করে সাধারণ শিক্ষা গ্রহন করে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এ সমস্ত অনাথ আশ্রম গুলো বড়–য়া ভিক্ষুদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হলেও চার ভাগের তিন ভাগ পাহাড়ি বৌদ্ধ সন্তানেরা অবস্থান করে শিক্ষা গ্রহন করতো। এ সমস্ত অনাথ আশ্রম গুলো ছাড়া বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করে বহু পাহাড়ি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ছেলে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। বলা বাহুল্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কারণে এ সমস্ত বৌদ্ধ বিহার ও অনাথ আশ্রমে আশ্রয় গ্রহন করে সাধারণ শিক্ষা গ্রহন করতে বাধ্য হয়। ভারতীয় সংঘরাজ ধর্মাধার মহাথের তাঁর লিখিত বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, চাকমা রাজবংশের সাথে বড়–য়াদের সাথে বহুবার রক্তের সম্পর্ক ঘটেছে। সমতল হতে পাহাড়ে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে তাঁেদরকে দুরে ফেলে রাখা চলবে না। তাই আমিও বলবো এই দুই বৌদ্ধ জাতি একের অপরের পুরিপুরক হয়ে সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকুক।
ফ্রান্সে অনাথ শিশুদের আশ্রয় লাভ :
১৯৮৬ সালে ১৪ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে “পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম”  সেটলার বাঙ্গালিরা আগুনে পুড়ে দিয়ে ধবংস করে দেয় এবং জায়গা জমিগুলো জবর দখল করে নেয়। এই সময় ৭০ হাজার পাহাড়ি বৌদ্ধ শরনার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় গ্রহন করতে বাধ্য হয়। অনাথ আশ্রমের ৩০০ এতিম শিশুর মধ্যে ৫০জন মোনঘরে এবং ২৫০ জন শিশু ১২ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু সাথে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয় (শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য মহাথেরোর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য, শিক্ষা, মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির জন্য নিবেদিত প্রাণ এক বৌদ্ধ সন্যাসী, মূল- প্রফেসর পিজে চাকমা, অনুবাদ স্বাগতম চাকমা, পৃঃ৭৮-১০৩)। তারা বছরের পর বছর শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করতে করতে কাটাচ্ছিল এক অনিশ্চয়তা ভরা জীবন। এই সময়ে আশ্রমের পক্ষ থেকে ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের যোগাযোগ করেন বিশ্বের বড় বড় সংস্থার সঙ্গে। তেমনই একটি সংগঠন ফ্রান্সের ‘পাতাজ’ (PARTAGE) সারা বিশ্বে দুর্গত শিশুদের নিয়ে কাজ করে সংস্থাটি। আশ্রমের আবেদনে পার্তেজ সাড়া দেয়। তাঁরা এই শিশুদের জন্য ফ্রান্সেই খুঁজে বের করে নতুন আশ্রয়। ফ্রান্সের অপরিসীম দরদী কিছু মানুষ এ সব শিশুর নতুন মা-বাবা হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পুনর্বাসনের জন্য পার্তেজ সংস্থাটি ব্যবস্থা নেওয়ায় শিশুদের যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়। এই শরণার্থী শিবিরে খেয়ে না খেয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে তাঁেদর জীবন শেষ হয়ে যাবে। এই সময় সবাই চেয়েছিল নিজেদের সন্তানদের এই উদ্বাস্তু জীবনের বাইরে যেতে। কেউ তাই মানা করেনি, যতই কষ্ট হোক, নিজের সন্তানকে ছেড়ে দিয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে। তারপর শিশুদের একসঙ্গে করা হয়। সব মিলিয়ে ৭২ জন। শেষ বেলায় তারা বিদায় নেয় বাকীদের কাছ থেকে। জানে না কেউই, কিছু রেখে গেল যাদের, এ জীবনে তাদের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে কি না? ১৯৮৭ সালে ৩০ অক্টোবর আগরতলা থেকে দিল্লী, তারপর উড়োজাহাজে উড়ে ফ্রান্সের মাটিতে পা রাখা। অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষা। হায় তবুও তো যেতেই হয়। আর কোনো উপায় তো ছিল না। ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের অক্লান্ত প্রচেষ্ঠায় ভারত সরকারের সহযোগিতা ও ফ্রান্স সরকারের অনুকম্পায় ৭২ জন পাহাড়ি বৌদ্ধ শিশুকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, এই ৭২ জন শিশুকে ফ্রান্সে পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের। বর্তমানে এই শিশুরা ইউরোপের মত উন্নত রাষ্ট্র ফান্সে নাগরিকত্ব লাভ করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এরা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করার জন্য “আহ্ঝ ইন্টার ন্যাশানাল ও ফ্রেন্ডড অব জুম্ম” দুটি সংগঠন গড়ে তুলেন (হিলচাদিগাং, সম্পাদক, শ্রীমৎ সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, ৯ নভেম্বর, ২০১২ইং, দেশান্তরের সেই বাহাত্তর দেবপুত্র, আরিফ জেবতিক (০২/০৪/২০১২), পৃষ্ঠা-১৪ইং)।।
এখানে একটি কথা বলতে বাধ্য হলাম যে, আমি মাঝে মধ্যে সময় পেলে পরম শ্রদ্ধেয় জ্ঞানশ্রী ভন্তের নিকট আর্শীবাদ গ্রহণ করতে যাই। তিনি একদিন কথার প্রসঙ্গে আমাকে বলেছেন, “বিমলতিষ্য একদিন্যা ট্রাক ভর্তিগড়ি ভারতদ ত্রিপুরা রাজ্যত শরণার্থী শিবিরত ত্রাণ সামগ্রী দিবাল্যাই লই গিয়ে। পুয়া বিচ্চ্যা টেঙা লোই কিন্ন্যা কইনে, ইয়ানি তারা ন লয়। এগিন হল্যা মানুষ তুঁইঙি চিন্তা গরি চ”। অর্থাৎ- বিমলতিষ্য একদিন ট্রাক ভর্তি করে ভারতে ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রিত চাকমা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ সামগ্রি নিয়ে যায়। তারা সে গুলো শিশু বিক্রি করে ক্রয় করা হয়েছে বলে গ্রহন করেনি। এগুলো কি রকম মানুষ তুমি চিন্তা করে দেখ।
অথচ ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের অনাথ শিশুদের দেখাশুনা করার জন্য মাতৃভূমি ও আতœীয়-স্বজনের সমস্ত মায়া মমতা ত্যাগ করে ভারতে প্রবাসী জীবন বেছে নিলেন তা উপলদ্ধি করতে পারলেন না। তিনি স্বজাতির দুঃখ দুর্দশা লাগবের বিষয় চিন্তা করে ৭২ শিশুকে ফ্রান্সে পাঠালেন অথচ আমাদের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবি তথা জাতীয় নেতা তাঁকে ছেলে বিক্রি করে খাওয়ার অপবাদ দিলেন। এখানে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, যারা একদিন শিশু পাচারকারী হসেবে অপবাদ দিয়েছে তারাই আজ ফ্রান্সে নাগরিকত্ব প্রাপ্ত ছেলেদের সাথে কিভাবে নিজেদের মেয়েকে বিয়ে দেবেন তজ্জন্য সেই ছেলে গুলো কখন দেশে আসবেন ওঁতপেতে বসে থাকেন। সেই সোনার ছেলেরা বর্তমানে আমাদের গর্ব এবং তাদের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বৌদ্ধরা ইউরোপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বর্তমানে তারা মাতৃভূমিতে এসে স্বজাতির মেয়েকে বিয়ে করে ফ্রান্সে নিয়ে যাচ্ছে এবং বাবা-মা, ভাই-বোন, আতœীয়-স্বজনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ফ্রান্সে অনাথ শিশুদের জন্য শিক্ষাসহ উন্নত জীবনের ব্যবস্তা করায় প্রতিদানে ভন্তেকে শিশু পাচারকারী অপবাদ শুনতে হয়েছে। পরিবার্তে সত্য স্বমহিমায় উদ্ভাসিত  হয়েছিল সহজাত নিয়মেই।
আশ্রমে প্রতিষ্ঠিত ও জনসাধারণের দায়িত্ব ও কর্তব্য :
একটি বটবৃক্ষ যখন শাখা-প্রশায় পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে ছায়া দান করে তখন পথশ্রান্ত পথিক সেই ¯িœগ্ধ ছায়া লাভ করে পথক্লান্তি দুরীভূত করে আবার নব উদ্যোমে পথ চলা শুরু করে। অনুরুপভাবে আশ্রমে আশ্রয়ে প্রতিষ্ঠিত ও সাধারণ ব্যক্তিদের মনে করতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিটি অনাথ আশ্রম গুলো হচ্ছে পাহাড়ি বৌদ্ধ জাতির শিক্ষার গ্রহনের তথা ধর্ম শিক্ষা গ্রহনের জন্য এক একটি বটবৃক্ষ স্বরুপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বৌদ্ধ জাতির বির্নিমাণে আশ্রম গুলোর অবদান এক বাক্যে আমাদের স্বীকার করতে হয়। তাই সকলের উচিত যে যেভাবে পারে সাহায্য সহযোগিতা করে এ প্রতিষ্ঠান গুলো ঠিকে রাখা। একটি দিন আলাপ-আলোচনা ছলে শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞানন্দ মহাথের বললেন, আমি বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে গরীব, অসহায়, অনাথ, খেতে না পাওয়া শিশুদের নিয়ে এসে আশ্রমে রেখে লালন-পালন করে বড় করেছি, লেখাপড়া, শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ করেছি। অথচ তারাই এখন প্রতিষ্টিত হয়ে আমার দিকেও ফিরে তাকায় না। আশ্রমে সাহায্য সহযোগিতা করা কথাই নাই বললাম। তারা বনবিহারে গিয়ে দামী দামী দানীয় সামগ্রীসহ মোটা অংকে দান দিয়ে আসে। তারা বেমালুম ভূলে গেছে যে, তারাও একদিন সেই অনাথ আশ্রমে আশ্রয় লাভ করে তিলে তিলে জীবন গড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যাঁরা সমাজ কিংবা জাতির উন্নতির কথা চিন্তা করে, তাদেরকে আমরা সাহায্য সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসি না। অথচ যে সমস্ত ভিক্ষু-শ্রমণেরা ধ্যান-সাধনার নামে সৌখিন ও বিলাস বহুল জীবন যাপন করে এবং সমাজের দুরাবস্থার বিষয়ে কোন ধারধারে না, তাদেরকে আরো সৌখীন, আরামপ্রিয় জীবন যাপন করার জন্য আপ্রাণ সহযোগিতা করে থাকি। এ হলো আমাদের সমাজের অবস্থা।
এখানে আরো বলতে বাধ্য হলাম, আমাদের সমাজে একশ্রেণী হীন মন-মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি আছে তারা প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রমেগুলো দখলের প্রচেষ্ঠায় থাকে। তারা সামগ্রিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে আশ্রম গুলো নিজের দখলে নিতে কটুবুদ্ধি প্রয়োগ করতেই থাকে। মোনঘর, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন, বনফুল চিড্রেন হোম অনাথ আশ্রম গুলো একসময় সাফল্যের উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিল এ সমস্ত কারণে আজ অসুস্থ রোগীর ন্যায় ডুকরে ডুকরে পথ চলছে। অথচ এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে এক সময় বহু বেকার মানুষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। বহু অনাথ, অসহায় শিশুদের আশ্রয়স্থান হয়েছিল সে কথা ভূলেই গেছে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের হীনস্বার্থের কারণে সেই সব প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের পথে। আমাদের সকলের উচিত যে সব প্রতিষ্ঠানে জাতিয় স্বার্থ নিহিত রয়েছে সে সব প্রতিষ্ঠান সকলের নিঃস্বার্থ ভাবে রক্ষা করা।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শিক্ষা বিস্তারের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা:
আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের শিক্ষা বিস্তারে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি নি¤œ প্রতিবন্ধকতাই প্রবলভাবে দেখা যায়। তা হল- একদিন এক উপাসক আমাকে এসে বলল, ‘ভন্তে আমি আমার ছেলেকে লেখাপড়া করাতে পারছি না, দয়া করে আপনি একটা উপায় করে দিন।’ তখন আমি তাকে বললাম- উপাসক! তোমার ছেলেকে আমার কাছে শ্রমণ করে দাও। আমি পরবর্তীতে সময় সুযোগ বুঝে অন্য একটা বৌদ্ধ বিহারে ভন্তের কাছে দিয়ে দেব। সেখানে অবস্থান করে তোমার ছেলে ধর্মচর্চার পাশাপাশি সাধারণ লেখাপড়াও করতে পারবে। তখন সে আমাকে বলল- ভন্তে! ‘বনবিহারের ভন্তেরা বলে থাকেন, ভিক্ষু শ্রমণ অবস্থায় লেখাপড়া করলে নাকি পাপ হয় ও নরকে যায়! আমি তাকে বললাম- ‘তাহলে তুমি এক কাজ কর বনবিহারে গিয়ে তোমার ছেলেকে শ্রমণ করে দাও, তাতে শিক্ষা করা লাগবে না বরং অনেক পুণ্য সঞ্চিত হবে আর নরকেও যেতে হবেনা। প্রচুর দান-দক্ষিণা লাভ করে ভালো টাকা-পয়সা উপার্জন করতে পারবে।’
সুধী সমাজ এবার দেখুন পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বৌদ্ধদের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে কিরুপ মনোভাব সৃষ্টি করা হয়ে। এরুপ মনোভাব যদি পোষণ করে থাকে তাহলে পাহাড়ি বৌদ্ধ জাতি আরো শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে পড়বে। কারণ শিক্ষাই হল জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা না থাকলে বর্তমান প্রতিযোগিতামুলক বিশ্বে কোন স্থান পাবে না। অতীতের ইতিহাসকে পড়লে দেখা যায়, শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তৃতীয় সংগীতিতে সমগ্র ত্রিপিটককে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর পরবতীর্তে বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ নালন্দা মহাবিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার ইত্যাদি বিহারের ভিক্ষু-শ্রমণেরা লেখাপড়া শিখে অবিদ্যা আচ্ছন্ন মানুষকে জ্ঞানের আলো দান করে বৌদ্ধ সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। এতে তাঁদের কী পাপ হয়েছে, তারা কি নরকে গমন করেছেন? আর যে সমস্ত ভিক্ষু-শ্রমণেরা পড়াশুনা করে পবিত্র ত্রিপিটককে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন তাঁদেরও কী পাপ হবে? তাঁরা যদি সমাজের জন্য এই মহান দায়িত্ব পালন না করতেন তাহলে আমরা কিভাবে বুদ্ধের অমৃতময় বাণী সম্পর্কে অবগত হতাম। যে সমস্ত ভিক্ষুরা পড়ালেখার ব্যাপারে অপব্যাখা দিয়ে থাকেন, আমার মনে হয়, তারা বুদ্ধের নির্দেশিত দ্বিবিধ ধুর (গ্রন্থধুর ও বিদর্শনধুর) সম্পর্কে অবগত নয়। এই জন্যে তারা উভয় ধুরের ধারে কাছেই নেই। যার কারণে তারা এরুপ বিরুপ মনোভাব পোষণ করে থাকে।
স্বর্গমর্ত পাক্ষিক ম্যাগাজিনে বাবু মিল্টন বিশ্বাসের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শিক্ষার বিস্তারের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের বলেছেন,  রংবস্ত্রধারীদের স্কুল ও কলেজে লেখাপড়া করার ব্যাপারে তথাকার একজন বৌদ্ধ শ্রমণ সাধনানন্দ ভিক্ষু ও তাঁর অনুসারীদের সাংঘাতিক অ্যালার্জি ছিল। আমরা যারা রংবস্ত্রধারণ করে শ্রামণের অবস্থায় নিবিড়ভাবে পড়ালেখায় নিরত ছিলাম- আমাদের ওপর ওই বৌদ্ধ শ্রামণ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুপ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের ব্যাপারে নানা কুৎসা রটনা, দুঃশীল হিসেবে অভিযুক্ত করা, বৈকালিক ভোজনের অপবাদ দেয়া, আমাদেরকে যাঁরা ¯েœহসিক্ত ও সমর্থনের বাতাবরণে মূল্যায়ণ করেন তাঁেদরকে নরকের ভয় দেখানো প্রভৃতি ছিল তাদের নিত্য নৈমনিত্তিক প্রচারণার অনুষঙ্গ। সাধনানন্দ ভিক্ষু (বনভিক্ষু) ও তার অনুসারীদের এবং কতিপয় বুর্জোয়া মানসিকতাসম্পন্ন মধ্যবিত্ত ধনগর্বী ধনিক শ্রেণির ঘৃন্য, হীন, মিথ্যায় পরিপূর্ণ নিন্দাবাদ প্রচার ও কুৎসা রটনার কারণে তাদের ওইসব অপবাদকে মিথ্যা পতিপন্ন করার লক্ষ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডবল এম, এ পাশ করে পাহাড়ি বৌদ্ধ সমাজের আরো কয়েক ডজন এম, এ পাশ সন্তান সৃষ্টি করে উপহার দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল ভদন্ত সাধনানন্দ ভিক্ষু যে ধ্যান সাধনার পদ্ধতি গ্রহন করে তাঁর শিষ্যদের যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তিনি কতজন তাঁর শিষ্য বা অনুসারীকে মার্গফল বা অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন তা দেখার বিষয়। তিনি নিজেই মার্গফল বা অর্হত্ব কোনটাই লাভ করতে পেরেছেন কিন সন্দেহ, অপরের কথাই কি বলবো।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭৪ সালে পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমটি পুর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অনাথাশ্রম রুপান্তর করতে গিয়ে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জটির সম্মুখীন হন এবং যার ফলে তিনি তাঁর স্বপ্নের অনাথ আশ্রমটি চিরতরে ত্যাগ করে চট্টগ্রামে চলে যেতে বাধ্য হন- সেটি হলো আঞ্চলিক রাজনীতির আত্মঘাতি সিদ্ধান্তপ্রসূত অভিঘাত। ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদটি গ্রহন করতে বাধ্য হন। পদটি গ্রহন করারপর আশ্রমের যাবতীয় চলমান কার্যক্রম রাখতে গিয়ে তথাকার ধুরন্দর  প্রতিক্রিয়াশীল ও আশ্রম বিদ্বেষী একটি গ্রুফ সাংঘাতিক প্রতিবন্ধকতা- সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়। তারা ভন্তেকে এমন কোন বাক্য বাদ দেয়নি গালিগালাজ করেছে, কামিনী ও কাঞ্চন সম্পর্কিত এমন কোন অপবাদ নেই, যা দিয়ে ঘায়েল করতে ব্যবহার করেছে। সেই ঘৃন্য, হীন, জঘন্য অপবাদ সমূহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহন করে শ্রদ্ধেয় ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের, ভদন্ত প্রিয়তিষ্য ভিক্ষু ও ভদন্ত জিনপাল ভিক্ষুসহ বারো জন ভিক্ষুসহ আত্মনিবেদিত প্রচেষ্ঠায় পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম একটি সার্বঙ্গ সুন্দর অনাথ আশ্রমরুপে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই অপতৎপরতাকারী চক্রটি রাঙ্গামাটিতে মোনঘর অনাথ আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
১৯৯৯ সালে ভূটানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত বাবু শরদেন্দু শেখর চাকমা বিদেশী দাতা সংস্থার নিকট একটি আত্মঘাতি চিঠি প্রেরণ করে বনফুল চিলড্রেন হোমস্- এর সমস্ত সাহায্য বন্ধ করে দেয়। ফলে আশ্রমটি বন্ধ হয়ে গেলে ২০৮ জন অনাথ শিশুরা মোনঘর আশ্রমে আশ্রয় গ্রহন করতে বাধ্য হয়। এ আত্মঘাতি কাজটির দ্বারা পাহাড়ি বৌদ্ধ জাতির জন্য কত অপুরনীয় ক্ষতি করেছেন হয়তো কোনদিন নিজে একবারের জন্যও অনুতপ্ত বোধ করেনি। আজ যদি এ প্রতিষ্ঠানটি ঠিকে থাকতো তাহলে কত অসহায়, অনাথ শিশু পড়াশুনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেত। এ সমস্ত কুলাঙ্গার, শিক্ষিত মূর্খ, জাতির অহিতকামী ব্যক্তিরা খুবই নিন্দিত ও ঘৃনিত হয় তাদের নিজেদের হীন কর্মকা-ের জন্য। তারা সমাজের উপকার তো দুরের কথা পরন্তু অপকারই বেশী করে থাক। তারা গরীবে পেটে লাঠি মেরে অট্টালিকায় আরাম আয়াসে নাক ডাকিয়ে ঘুমায়। অসহায়, গরীবের হাহাকার তারা কখনও শুনতে পায় না। যদি একটু ঘুরে দেখেন দেখতে পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও সমতলে বড়–য়াদের প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে কত অসহায়, অনাথ শিশু দুঃখ কষ্ঠে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে তবেই বুঝতে পারবেন। সেই জন্যে যে কোন কাজ করার আগে শতবার ভাবতে হয়।
সাক্ষাৎকারে ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের আরো বলেছেন, ১৯৯৭ সালে মোনঘর ও বনফুল চিলড্রেন হোম- এর চালুকৃত শিক্ষা বিস্তারমূলক কার্যক্রমকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়ার লক্ষ্যে অর্থ ও নারী কেলেঙ্কারির জঘন্য বেনামি চিঠির বন্য বইয়ে দেয়া হয়েছিল, ফলে পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়। ১৯৯৯ সালের শেষভাগে প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় দায়িত্বভার অর্পন করতে বাধ্য হয়। মোনঘর-এর প্রত্যক্ষ অর্থায়নে সবচাইতে সুবিধাভোগী, নিজের হাত গড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীধারী দশজন ছেলে তাঁকে মোনঘর থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তৎপরতা চালায়। এর ফলে ২০০৮ সালে ২৩ মার্চ মোনঘর শিশু সদনের সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, তাঁকে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করারও অপবাদ দেয়া হয়েছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের পুত্রসম মনে করে জীবন যৌবন সবকিছু ত্যাগ করে তিল তিল করে রক্ত ও স্বেদবিন্দু দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিদান এটাই কি প্রাপ্য ছিল তাঁর? (তথ্যসূত্র: স্বর্গমর্ত, পাক্ষিক ম্যাগাজিন, শিক্ষাবিদ প্রজ্ঞানন্দ মহাথের সাক্ষাৎকার, সংখ্যা-১৬-১৭, ১৬ আগস্ট-১৫সেপ্টেম্বর-২০০১৫ইং, পৃষ্ঠা-৮,১১)।
অনুরুপভাবে ২০০৭ সালে পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ভদন্ত সুমনালংকার মহাথেরকেও আশ্রমে লালিত পালিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠান হতে সরিয়ে দিতে চেষ্ঠা করা হয়। তাঁরা নারী ও অর্থ কেলেঙ্কারী মত জঘন্য মিথ্যা অপবাদ দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি। প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ডাটা কম্পিউটার থেকে ডিলিট করে দেয়া হয় এবং ভন্তেকেও যথেষ্ঠ পরিমাণে লাঞ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে সরকারের হস্তক্ষেপে অপতৎপরতাকারীরা লেজগুটিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে যা ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে তা কখনও পুরণ হবার নয়। যার ফলে আজও প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ইতিপূর্বেও  তাঁকে হীনমন মানসিকতা সম্পন্ন, লোভী, স্বার্থপর ব্যক্তিরা ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ সালে দুইবার আশ্রমের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ক্ষমতা গ্রহন করে। পরবর্তীতে আশ্রমটি চালাতে অসমর্থ হয়ে পুনরায় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে লজ্জার মাথা বোজা নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
শিক্ষা ও ধর্ম বিস্তারে শিক্ষিত ভিক্ষুর প্রয়োজনীয়তা:
শিক্ষা ও ধর্ম প্রসারে শিক্ষিত ভিক্ষুর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমরা জানি প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারের বিহার প্রধানকে অধ্যক্ষ বলা হয়। পাশাপাশি এক একটি কলেজের প্রধানকে বলা হয় অধ্যক্ষ। কেন অধ্যক্ষ বলা হয়? আমরা জানি প্রাচীন কালে তক্ষশীলা, নালান্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরি, ময়নামতির শালবন বিহার, চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার ইত্যাদি বিহারসমূহ ছিল এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এ সমস্ত বিদ্যাপীঠের প্রধান হলেন অধ্যক্ষ। সম্ভবতঃ সেই ঐতিহ্য অনুসারে এক একটি বিহারকে বিদ্যাপীঠ মনে করে বিহার প্রধানকে অধ্যক্ষ বলা হয়। এক একটা বিহার পরিচালনা করতে গৃহী হতে ভিক্ষু শিক্ষার শক্তিতে শক্তিবান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশী। কারণ আত্মহিত, পরহিত বা উভয়হিত সম্পাদনের জন্যই মানুষ ভিক্ষু হয়। ঐ শক্তির অভাবে ভিক্ষুর আত্মহিত, করা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি পরহিত করা আরও দু:সাধ্য। শিক্ষিত ভিক্ষুর দ্বারা আত্মহিত পরহিত এবং উভয়হিত সহজেই হতে পারে। তাই সমাজে শিক্ষিত ভিক্ষুর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমরা জানি ভারতবর্ষ থেকে যখন বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয় তখন আচার্য বুদ্ধ ঘোষ প্রমূখ ভিক্ষুরা শ্রীলংকায় গমন করে বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে শিক্ষা গ্রহন করে। শিক্ষা শেষে ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তন করে নব উদ্যোমে সমস্ত ত্রিপিটক পালি ভাষায় রচনা করতে সক্ষম হন। তাই প্রকৃত বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার ও প্রসার একমাত্র শিক্ষিত ভিক্ষুরাই  করতে পারে।
আমাদের সমাজে অর্হৎ নামধারী কতগুলো ভিক্ষু আছেন তারা বলে থাকে বি, এ পাশ করলে একচোখ কানা হয়, এম, এ পাশ করলে দুই চোখ কানা হয়। অবশ্যই তারাও এখন বুঝতে পেরেছেন শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু। তারাও এখন এস, এস, সি পাশ না করতে উপসম্পদা বা প্রবজ্যা ধর্মে দীক্ষা দেন না। দুঃখের বিষয় হল আমরা অসময়ে বুঝতে সক্ষম হই। যখন বুঝি তখন আর কিছু করার থাকে না। যেমন রোগীর রোগ যখন বেশী হয় তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। অসময়ে ডাক্তারের কিছু করার থাকে না। আসল কথা হলো, শিক্ষিত ভিক্ষু তো এমনি এমনি পাওয়া যায় না। শিক্ষিত ভিক্ষু পেতে হলে তাকে শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলতে হবে।
অগ্রবংশ মহাথের, ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের, ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের প্রমূখ উচ্চ শিক্ষিত ভিক্ষুসংঘ পার্বত্য চট্টগ্রামে জন্ম না হতেন তাহলে পাহাড়ি বৌদ্ধরা শিক্ষা-দীক্ষায় আজ এতটুকু অগ্রগতি কল্পনা করাই যেত না। তাঁরা একাধারে নিজেরাই যেমন শিক্ষা-দীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত তেমনি জাতিকেও শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করতে আপ্রাণ প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সবাই কর্তব্য তাঁদের এ মহৎ কর্মযজ্ঞে কায়িক, বাচনিক ও আর্থিকভাবে যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করা। বুদ্ধ বলেছেন- মানব জীবন অতীব দুর্লভ। এই দুর্লভ মানব জীবন তখনই স্বার্থকে পরিণত হয় যারা পরের কল্যাণে নিজেকে বিলয়ে দেন। এই মহানব্রত ধারণ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শাসন সর্দ্ধম তথা সমাজ ও জাতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বিধায় তাঁরা শিক্ষা বিস্তারে মহৎকর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের পরিশেষে বলা যায় যে, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বৌদ্ধদের শিক্ষা বিস্তারের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ভূমিকা ও আতœত্যাগ এক বাক্যে স্বীকার করতে হয়। রাজগুরু এই মহৎ কর্মকে জাতি স্বীকার করুক আর না করুক কিন্তু এঁদের অভাব একদিন সবাই অনুভব করবে।
লেখক পরিচিতিঃ সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বি, এ (অনার্স) এম. এ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, এম, এড, দারুল আহসান বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যক্ষ, হিলচাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, যুগ্ন-সচিব, পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ- বাংলাদেশ, সচিব, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.