yllix.com

Monetize your website traffic with yX Media

** বৌদ্ধ ধর্মে নিকায় বিভাগের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর?

11209747_368128900059553_1099605901775230093_n
উত্তর ঃ  সুচনা ঃ গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাব এক অবিস্বরণীয় ঘটনা। তিনি ছয় বছর কঠোর সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে জগতে বুদ্ধ নামে অভিহিত হন। তারপর দীর্ঘ ৪৫ বছর পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচার করেন। তাঁর ধর্ম প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে লোক ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা নিল, গঠিত হল বৃহৎ সংঘ। তাঁদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। অবশেষে আশি বৎসর বয়সে বুদ্ধ পরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধ পরিনির্বাণের পর একশত বছর পর্যন্ত তাঁর শিষ্যরা ধর্ম প্রচার করেন। তারপর কৌশ্বাম্বীর বর্জিপুত্র ভিক্ষুরা “দশ বত্থুনি ধর্ম” প্রচার করলে ভিক্ষুসংঘ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। সম্রাট অশোক সময়কাল পর্যন্ত আঠার নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নিম্নে নিকায় বিভাগের কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করা গেল ঃ
নিকায় বিভাগের কারণ ঃ তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর উপদেশ ও বাণী গুরুশিষ্য পরম্পরা মুখে মুখে একশত বৎসর পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। তারপর অর্থাৎ প্রথম সংগীতির একশত বৎসর পরে আনুমানিক খৃীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বৈশালীর বার হাজার বর্জিপুত্র ভিক্ষুরা বিনয় বর্হিভূত “দশ বত্থুনি ধর্ম” প্রচলন করলে ভিক্ষু সংঘের মধ্যে এক ঘোর মতভেদ দেখা দেয়। ফলে দ্বিতীয় সংগীতির অধিবেশনে “দশ বত্থুনি ধর্ম” বিচারে ভিক্ষুসংঘ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাঁদের মধ্যে একপক্ষ বিদ্রোহী হয়ে কৌশ্বাম্বী  মন্ডলে গিয়ে এক মহা সভায় মিলিত হয়। সে সভায় দশ সহস্রাধিক ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন, তাই তাকে মহাসংঘ বা মহাসংঘীতি নামে অভিহিত করা হয়। এভাবে ভিক্ষু সংঘ স্থবিবাদ ও মহাসাংঘিক এই দুই নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
মহাসাংঘিক নিকায় হতে কালান্তরে গোকুলিক হতে প্রজ্ঞপ্তিবাদী ও বাহুলিক এবং বাহুলিক হতে চৈত্যবাদী নিকায়ের উৎপত্তি হয়। এভাবে ছয়টি নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে স্থবিরবাদ হতে মহীশাসক ও বাৎসীপুত্রীয় এ দই নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তৎমধ্যে মহীশাসক হতে সর্বাস্তিবাদ ও ধর্মগুপ্তিক নিকায়ে বিভক্ত হয়। পূনঃ সর্বাস্তিবাদ হতে কাশ্যপীয়, কশ্যপীয় হতে সংক্রান্তিক, সংক্রান্তিক হতে সৌত্রান্তিক নিকায়ের উদ্ভব হয়। অপর পক্ষে বাৎসীপুত্রীয় হতে ধমোত্তরীয়, ভদ্রযানিক, ছন্নগারিক ও সম্মিতীয় নিকায়ে বিভক্ত হয়। এভাবে স্থবিরবাদ বা থেরবাদ বার নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এ মতভেদের কারণ বৌদ্ধ সংঘের মধ্যে নবীন চিন্তা ধারার বিকাশ লাভ করেছিল। কৌশ্বাম্বী, অবন্তী ইত্যাদি পশ্চিমা দেশের প্রতিনিধিরা ছিলেন প্রাচীন পন্থীর অনুগামী এবং বৈশালী, পাটলিপুত্র ইত্যাদি প্রাচ্য দেশীয় ভিক্ষুরা ছিলেন নবীন মতের অনুসারী। এক কথায় বলতে গেলে প্রাচীন পন্থী ও নবীন পন্থ’ীর মধ্যে মতভেদ ছিল। প্রাচীন পন্থী বহু ভিক্ষু নবীন ভিক্ষুদের সঙ্গে কিছুকাল পাটলিপুত্র ও তৎপার্শ্ববতী স্থানে বাস করেছিলেন সত্য, কিন্তু নৈতিকতা বজায় রেখে কতগুলো আচার-অনুস্থান পালনে অসুবিধা বোধ করলে তারা অধিকাংশ কৌশ্বাম্বী, অবন্তা ইত্যাদি স্থানে চলে যায়। পূর্বদিকে পাটলিপুত্র, বৈশালী ইত্যাদি স্থানে প্রায় একছত্র অধিকার পেয়ে নবীন মতবাদীরা প্রভাব বিস্তার লাভ করল। পরন্তু তারা যে সব জায়গায় প্রাচীন পন্থী অবস্থান করেছিল সে সব জায়গায় দলে দলে প্রচারক ভিক্ষু পাঠাতে লাগলেন। ফলে আচার ও শীল হতে যে অনৈক্যের উদ্ভব হল, তাই নীতিগত পার্থক্যের জন্য দেখতে দেখতে বৌদ্ধদের মধ্যে একটির পর একটি করে আঠার নিকায়ের আবির্ভাব হল।
নিকায় বিভাগের ফলাফল ঃ সম্রাট অশোকের সময় পর্যন্ত বৌদ্ধ সংঘ আঠার নিকায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং তৃতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে বিভিন্ন শাখা-উপশাখায় বন্যায় এক বিভীষিকার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় কোনটি প্রকৃত বুদ্ধের ধর্মত তা জনসাধারণের বোধগম ছিল না। এর ঘোরতর বিভীষিকার হাত হতে বৌদ্ধ ধর্মকে রক্ষার জন্য অধিকন্তু বৌদ্ধধর্মের স্বরুপ অবগতির জন্য মহারাজ অশোক আনুমানিক ২৪৬ খৃীষ্টপূর্বে পাটলিপুত্রের অশোকারামে এক মহাধর্মসভার আহব্বান করেন। উক্ত সভায় এক স্থবীরবাদী নিকায়কে মূল বৌদ্ধ ধর্মের মর্যাদা দেন এবং বাকী সকলকে সংঘ হতে বহিষ্কার করে দেন। সে সভায় মৌদগলীপুত্র তিষ্য স্থবিরের  সভাপতিত্বে অনুষ্টিত এবং ত্রিপিটক বুদ্ধ বচনের পুরা সংকলন প্রস্তুত হয়।
সম্রাট অশোক এ সংগীতির পরে ভিক্ষু সংঘকে দেশে-বিদেশে ধর্ম প্রচার করা শুধু পার্শ¦বর্তী রাষ্ট্র সমূহের ধর্ম প্রচারে ক্ষান্ত হননি। তারা ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা ও সভ্যতাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে মানব প্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রর্দশন করেছেন। সম্রাট অশোক বুদ্ধের ধাতু সংগ্রহ করে রাজ্যের মধ্যে চুরাশি হাজার চৈত্য নির্মাণ করে ভিক্ষু সংঘকে দান করেছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতাই বৌদ্ধধর্ম আজ বিশ্ব ধর্মে পরিণত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরেও আজ বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ লোক এ ধর্মের অনুসারী।
তিনি দেশে-বিদেশে ধর্ম প্রচারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে বলে ধর্মাশোক নামে অভিহিত হন। বৌদ্ধ ধর্মের নিকায় বিভাগের অন্যতম ফলাফল হিসেবে আমরা গণ্য করতে পারি। সম্রাট অশোক স্বদেশে স্বয়ং বিহার যাত্রার পরিবর্তে ধর্ম যাত্রার প্রচলন করেন। তিনি জনসাধারণকে ধর্মানুশীলনের প্রতি উদ্ভূদ্ধ করার জন্য রাজুক, যুত, মহামাত্র উপাধী ধারী কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। এভাবে তিনি বহুবিধ ভূমিকা রেখে বিশ্বে চিরস্মরনীয় হয়ে রয়েছেন।
উপসংহার ঃ পরিশেষে বলা যায় যে, বৌদ্ধ ধর্মে নিকায় বিভাগের ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ফলে সম্রাট অশোক তৃতীয় সংগীতি আহব্বান করতে বাধ্য হন। এ সুবাধে বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্ব ব্যাপি প্রচারিত হওয়ার পথ সুগম হয়েছিল। আজ এ ধর্ম বিশ্ব ধর্মে পরিণত হয়েছে।
লেখক পরিচিতিঃ সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বি, এ (অনার্স) এম. এ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, এম, এড, দারুল আহসান বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যক্ষ, হিলচাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, যুগ্ন-সচিব, পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ- বাংলাদেশ, সচিব, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.