** কথাবত্থু রচয়িতা কে ? এর রচনাকালসহ মূলবিষয়বস্তু আলোচনা কর
উত্তর ঃ রচয়িতা কে ঃ কথাবত্থু রচয়িতা ছিলেন মো¹লিপুত্ত স্থবির। প্রাক-মৌর্য যুগে এবং অশোকের সমসাময়িক কালে বহু মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন সন্যাসী বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের প্রবেশ করে নানা প্রকার অনাচারের দ্বারা সংঘের সুনাম নষ্ট করতেছিল। তাঁরা শুধু বিনয়ের নিয়মবঙ্গ করে চলত তা নয়, কেউ কেউ আবার নানা প্রকারের ভিন্ন মতও পোষণ করত। এই অবস্থায় কে সৎ বা প্রকৃত ভিক্ষু এবং কে মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কথিত আছে, এই সময় সংঘের অবস্থা এমন হয়ে পড়েছিল যে শীলবান ভিক্ষুরা সংঘের সম্পর্ক ত্যাগ করে অরণ্যে আশ্রয় গ্রহন করতে বাধ্য হয়েছিল। বহুদিন পাটলিপুত্রের ভিক্ষুরা নিজেদের মত বুদ্ধ প্রচারিত মতের সাথে অভিন্ন বলে প্রচার করতে থাকে। এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন পরস্পর বিরোধীমত সমূহের সামঞ্জস্য বিধান ও পরমত খন্ডনের জন্য সম্রাট অশোকের পৃষ্টপোষকতায় তৃতীয় সংগীতি আহ্বান করে মো¹লিপুত্ত তিস্য স্থবিব এই “কথাবত্থু” গ্রন্থ রচনা করেন।
রচনাকাল ঃ “কথাবত্থু” গ্রন্থটি রচনাকাল সম্পর্কে আধুনিক পন্ডিতগণ সন্দেহ পোষন করেন। সমন্তপাসাদিকাও সিংহলী ইতিহাসকাব্য মহাবংশ অনুসারে অশোকের সময় বৌদ্ধ সংঘ নানা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। লাভ সৎকারের জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন বহু সন্ন্যাসী বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করে যথেচ্ছাচার করতেছিল। থেরবাদ সম্প্রদায়কে বিশুদ্ধ রাখার জন্য অশোকের সহযোগিতায় মো¹লিপুত্ত তিস্য সংগীতি আহ্বান করেন। সম্মেলনের পূর্বে ভিন্ন মতবাদীদের শ্বেতবস্ত্র পরিধান করে সংঘ হতে বহিস্কার করা হয়। এত ক্ষান্ত না হয়ে মো¹ণিপুত্ত বিরুদ্ধ মতবাদ খন্ডন করে থেরবাদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ করার প্রয়োজন অনুভব করেন।
বুদ্ধঘোষ খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে “কথাবত্থুর” টীকা গ্রন্থ রচনা করেন। এটি ২৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত ছিল। ইউন্টারনিজের মতে গ্রন্থের কিছু অংশ অশোকের সময়ে রচিত হয়েছিল এবং অবশিষ্ট অংশ পরবর্তীকালে কোন এক সময়ে রচিত হয়েছে। তবে যে অংশে “বৈতল্যক, হৈমবত, শৈর ইত্যাদি সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে সে অংশ অশোকের অনেক পরে রচিত হয়েছে। সুতরাং সম্পূর্ন “কথাবত্থু” যে খৃঃ পূঃ তৃতীয় শতাব্দীতে সংকলিত হয়নি তা নিশ্চিত।
মূল বিষয়বস্তু ঃ “কথাবত্থু” মূলবিষয়বস্তু হল মিথ্যাদৃষ্টিক ও বিরুদ্ধবাদীদের মিথ্যা অভিমত বা যুক্তি খন্ডন করার উদ্দেশ্য এ গ্রন্থের রচনা বা মুলবিষয়বস্তু। বৌদ্ধ সাহিত্যে এ গ্রন্থের একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার রয়েছে। এতে আমরা যেমন বৌদ্ধ প্রজ্ঞার পরিচয় পাই তেমনি পরবর্তী যুগে অভিধর্ম শাস্ত্রের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে এটি যথেষ্ট আলোকপাত করে। বিভিন্নবৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ইতিহাস সম্পর্কেও এটি একটি তথ্যের উৎস।
“কথাবত্থু” গ্রন্থটির রচনা – নৈপূন্য, আঙ্গিক – বৈশিষ্ট্য এমন কি ভাষার দিক দিয়েও এটি অন্যান্য গ্রন্থের চেয়ে বৈচিত্র্যময়, যেই ধারাবাহিক গতানুগতিকতায় ত্রিপিটক প্রন্থ সমূহ রচিত তা হতে “কথাবত্থু” রচনা পদ্ধতি সম্পূর্ন ভিন্ন। ত্রিপিটকের অন্যান্য গ্রন্থে কোথাও লেখকের নামোল্লেখ করা হয়নি। কথাবত্থুতে রচয়িতার নাম স্পষ্টভাবে প্রদত্ত হয়েছে। অশোকের ধর্মগুরু মো¹লিপুত্ত স্থবির এই বিশাল গ্রন্থের রচয়িতা। অশোকের রাজত্বকালে তৃতীয় বৌদ্ধ মহাসংগীতির অবসানে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন।
স্থবির মো¹লিপুত্ত তাঁর গ্রন্থ রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। গ্রন্থের আলোচনা হতে জানা যায় যে তিনি শুধু একজন চরিত্রবান ভিক্ষু ছিলেন না পুস্তুকের গ্রন্থনায় ও তাঁর পান্ডিত্যের পরিচয় পাওয় যায়। ভাব, ভাষা ও রচনায় বৈশিষ্ট্যে এটি ত্রিপিটক গ্রন্থের চেয়ে মিলিন্দ প্রশ্নের সঙ্গে বিশেষ ভাবে তুলনীয়। বিভিন্ন জটিল দার্শনিক তত্ত্বের উত্তর প্রত্যুত্তর প্রদান রচয়িতার কুশলীশক্তি ও অভিজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। এতে লেখকের সুগভীর মননশীলতা ও সুরুচিপূর্ণ সাহিত্যিক অনুরাগ পরিস্ফুট।
মিলিন্দ প্রশ্নে দেখা যায়, স্থবির নাগসেন বৌদ্ধ সম্প্রদায় বর্হিভূত রাজা মিলিন্দের বিবিধ প্রকার জটিল প্রশ্নের যথাযথ প্রত্যুত্তর প্রদান করে স্বীয় মতের প্রাদান্য স্থাপন করেছেন। কিন্তু কথাবত্থুতে মো¹লিপুত্তের সাথে বৌদ্ধসংঘের অনুপ্রবিষ্ট বিভিন্ন মতবাদীদের কথোপকথন হয় এবং পরস্পর উত্ত-প্রত্যুত্তরের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, লেখক মতই যুক্তিযুক্ত। থেরবাদ সম্বন্ধে লেখক তিষ্যের সজ্ঞান আলোচনায় এই গ্রন্থ সমৃদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায় যে, “কথাবত্থু” গ্রন্থটি অভিধর্ম পিটকে একটি অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ। এটি তৃতীয় সংগীতি পর পরই মো¹লিপুত্ত তিস্য স্থবির রচনা করেন। এতে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পরমতবাদ খন্ডন করে থেরবাদ ধর্মের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
লেখক পরিচিতিঃ সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু, বি, এ (অনার্স) এম. এ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, এম, এড, দারুল আহসান বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যক্ষ, হিলচাদিগাং বৌদ্ধ বিহার, যুগ্ন-সচিব, পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ- বাংলাদেশ, সচিব, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন।








কোন মন্তব্য নেই